• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮ আশ্বিন ১৪২৬, ২৩ মহররম ১৪৪১

এটাই বাকি ছিল

শেষ পর্যন্ত হার আফগানিস্তানের কাছে !

সংবাদ :
  • বিশেষ প্রতিনিধি

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

image

টেস্ট জয়ের উল্লাসে মেতে ওঠে আফগানিস্তান দল

চট্টগ্রাম টেস্টের চতুর্থ দিনে রোববারই পরাজয়ের মুখে ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। দলপতি সাকিব আল হাসান সে দিনই প্রেস কনফারেন্সে এই টেস্ট জয়ের ফর্মুলাও বলেছিলেন। বিকল্প হিসেবে টেস্ট বাঁচানোর দায়িত্ব বৃষ্টির ওপর ছেড়েছিলেন সাকিব। তার কোনটাই হয়নি। সাকিব নিজে আউট হয়েছেন একেবারেই যাচ্ছেতাই ভাবে, সৌম্য শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে ফিরেছেন। দিনের অনেকটা সময় বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে চট্টগ্রাম ভাসিয়েছে বৃষ্টি। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। বাংলাদেশ দল টেস্ট অঙ্গনে একেবারেই নবীন আফগানিস্তানের কাছে ২২৪ রানের বড় ব্যবধানে লজ্জানকভাবে হেরেছে চট্টগ্রাম টেস্ট। সাকিব কি বলবেন যে, বৃষ্টির কারণে ব্যাটিংয়ে নামতে না পারায় তার দেড়শ রান করা হয়নি বা সৌম্যর সেঞ্চুরিটা হয়নি? তেমন কথা বলার সুযোগ কোথায়? রোববার থেকে শুরু হয়েছিল বৃষ্টি। সোমবার দিনের অনেকটা সময় ভেসে গিয়েছিল বৃষ্টিতে। কিন্তু আফগান অধিনায়ক রশিদ খান যে বলছিলেন মাত্র দশ ওভার খেলতে পারলেই বাংলাদেশকে অল আউট করে টেস্ট জিতবেন, সেই কথা ক্রিকেট দেবতা বোধ হয় শুনেছিলেন। খেলা হলো মাত্র ২০ ওভার। তার মধ্যে ১৭.৪ ওভারেই বাংলাদেশকে অল আউট করে ক্রিকেট ঈশ্বরের দেয়া সময়টার সদ্ব্যবহার করলেন আফগান অধিনায়ক। মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই দেশের জন্য আনলেন দ্বিতীয় জয়। অথচ বাংলাদেশ দলকে এরকম জয় পেতে খেলতে হয়েছে ৬০টা ম্যাচ। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে বৃষ্টির কারণে শেষ দিনের প্রথম সেশন বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার পর মাঝপথে গড়িয়েছিল খেলা। দুপুর ১টায় দু’দল মাঠে নেমে খেলতে পেরেছিল মাত্র তিন ওভার। ফের বৃষ্টি হানা দিলে চা বিরতির সময়ের পরের একঘন্টাও মাঠে গড়ায়নি বল। বৃষ্টি থামলে বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে শেষ সেশনে খেলতে নেমেও ব্যাট হাতে প্রতিরোধ গড়তে পারেনি বাংলাদেশ। কাবুলিওয়ালার দেশের মানুষের পরিশ্রমী স্বভাবের কথা কারও অজানা নয়। দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে যুদ্ধের কারণে বিধ্বস্ত আফগানিস্তান। যে দেশের শিশুরা বড় হয় অ্যাসল্ট রাইফেল আর গোলাবারুদকে খেলনা হিসেবে দেখতে দেখতে, যে দেশটায় নেই কোন ক্রিকেট স্টেডিয়াম, যে দেশের ক্রিকেটাররা বড় হয়েছে শরনার্থী শিবিরে, ক্রিকেট দলকে স্পন্সরের জন্য যেখানে তাকিয়ে থাকতে হয় ভারতের দিকে, সেই দেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে প্রাচুর্যের মধ্যে সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে আরাম আয়েশে থাকা বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের কমিটমেন্টের পার্থক্যটা চট্টগ্রাম টেস্ট পরিস্কার করে দিল।

গত বিশ্বকাপের সময় থেকেই বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে ‘গৃহবিবাদ’ নিয়ে কথা হচ্ছে। সেই গৃহবিবাদ কি তাহলে থামেনি? ড্রেসিংরুমের করুণ দশাই কি দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে টেস্ট খেলা বাংলাদেশ দলের এমন পরাজয়ের কারণ? প্রশ্নগুলো এখন স্বাভাবিকভাবেই উঠবে। ক্রিকইনফোর সঙ্গে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সাকিব বলেছিলেন, তিনি কোন ফরম্যাটেই বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো মানসিক অবস্থায় নেই। নেতৃত্ব দিতে গেলে নিজের খেলার ওপর চাপ পড়ে বলে সাকিব জানিয়েছিলেন ওই সাক্ষাৎকারে। নেতৃত্ব পাওয়ার পর সাকিবের পারফরম্যান্সে যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, এটা সুস্পষ্ট। তাহলে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেবেন কে? বোর্ড কর্তারা কি তেমন কিছু ভেবেছেন কখনও? আফগানিস্তানের বিপক্ষে দলের বেহাল দশা দেখে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন, লিটন কুমার দাস ও সৌম্য সরকার টেস্টের জন্য উপযোগী ব্যাটসম্যান নন। তাহলে? নির্বাচকরা নতুন কাউকে কেন পাচ্ছেন না? কেন ঘরোয়া আসর থেকে খেলোয়াড় উঠে আসছে না? কেন রিজার্ভ বেঞ্চ শক্তিশালী হচ্ছে না?

যে দেশের বোর্ড এখন বিপুল অঙ্কের টাকা আয় করে, তারা কিনা আফগানিস্তানের মত যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটা দেশের ক্রিকেট দলের বিরূদ্ধে লড়াই করার মতো একাদশে টেস্টের ব্যাটসম্যান পায় না। হাস্যকর যুক্তি বৈকি! আবার যে দেশের ক্রিকেটাররা তারকা খ্যাতি পেয়ে রাতারাতি বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করেন, দেশের ক্রিকেটের প্রতি তাদের কমিটমেন্ট কতটুকু সেই প্রশ্নও কিন্তু করা যেতে পারে। ক্রিকেটাররা খেলার জন্যই বেতন পান। দেশের মানুষ তাদের জয় দেখতে চায়। বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা কোন একটা সিরিজ জিতলেও জুটে যায়, ফ্ল্যাট গাড়ি জমির মত বহু পুরস্কার। এসব পুরস্কার দেয়ার মূল উদ্দেশ্য ক্রিকেটারদের উৎসাহ দেয়া হলেও, বাংলাদেশের ক্রিকেট যেন দিনে দিনে তলানিতেই ঠেকছে।

নাহলে চট্টগ্রাম টেস্টে চতুর্থ দিনে ছয় উইকেটে তোলা ১৩৬ রান নিয়ে শেষদিনে মাত্র ২০ ওভারও টিকবেন না কেন সাকিব-সৌম্য’র মতো দুই ব্যাটসম্যান। মাত্র ৩৭ রান তুলে কেন অল আউট হবেন তারা। যেখানে সাকিব-সৌম্যর সঙ্গে মেহেদি মিরাজের মত স্বীকৃত ব্যাটসম্যানও ছিলেন একজন।

লজ্জাজনক এই পরাজয়ের আশঙ্কা ভর করেছিল ম্যাচের চতুর্থ দিনেই। ৩৯৮ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে ১৩৬ রানে ছয় উইকেট হারিয়েছিল বাংলাদেশ দল।

পঞ্চম দিনের অনেকটা সময় বৃষ্টিতে ভাসিয়ে নেয়ার পর সাকিব এবং সৌম্য যখন ব্যাটিংয়ে নামেন তখন কাজ ছিল কোনমতে ২০ ওভার পার করা। দলের এমন অবস্থায় সাকিব যেখানে দেড়শ রান করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, সেখানে জহির খানের স্পেলের প্রথম বলেই ক্যাচ দিলেন উইকেটের পেছনে। শর্ট লেন্থ বলটা ছিল অফ স্ট্যাম্পের অনেকটা বাইরের। ক্রিকইনফোর কমেন্ট্রিতে লেখা হয়েছে, ওহে সাকিব, এই বলটা তুমি কেন মারতে গেলে? অফ স্ট্যাম্পের বাইরের এই বলটা ছেড়ে দিলে কোন ক্ষতিই হতো না। অথচ ওটায় কাট করতে গিয়ে সাকিব ধরা পড়লেন উইকেটকিপার আফসার জাজাইয়ের গ্লাভসে। পরের কাজটা সেরেছেন আফগান অধিনায়ক রশীদ খান। মেহেদি মিরাজ (১২) ও তাইজুলকে (০) লেগ বিফোর উইকেটের ফাঁদে জড়ানোর পর শেষ ব্যাটসম্যান হিসাবে সৌম্য সরকারকে (১৫) ইব্রাহিম জাদরানের হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেছেন আফগান অধিনায়ক। অবশ্য তাইজুলের আউটটি ছিল বিতর্কিত। আম্পায়ার লেগ বিফোর উইকেটের আবেদনে আঙুল তুললেও রিপ্লেতে দেখা গেছে যে, প্যাডে আঘাত করার আগে বল ব্যাটে লেগেছিল।

বলে রাখা ভালো, প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট শিকারের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ৪৯ রানে ৬ উইকেট শিকার করেন আফগান অধিনায়ক রশিদ খান। প্রথম ইনিংসে ঝড়ো হাফ সেঞ্চুরির সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংসে ২২ বলে তুলেছেন ২৪ রান (বাংলাদেশ দলের বোলারদের বেহাল দশা বোঝানোর জন্য আর কিছু প্রয়োজন পড়ে না)। বলা যায় দলকে সামনে থেকে দিয়েছেন নেতৃত্ব। ম্যাচ সেরার পুরস্কারটাও ওঠেছে আফগান অধিনায়কের হাতেই। যদিও বা রহমত শাহের সেঞ্চুরি, আজগর আফগান, আফজার জাজাই বা ইব্রাহিম জাদরানের ব্যাট হাতে দৃঢ়তা এই টেস্ট জয়ে কোন অংশেই কম ছিল না। আফগানিস্তান দল জিতেছে দলগতভাবে পরিশ্রম করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ দলের পরাজয়ই বলে দেয় দলগত নৈপুণ্যের অবস্থা কতাটা বেহাল। প্রথম ইনিংসে এক মুমনিুলের হাফ সেঞ্চুরি ছাড়া বলার মত স্কোরই যে নেই একজনেরও।