• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১কার্তিক ১৪২৬, ১৬ সফর ১৪৪১

তিউনিশিয়ায় নৌকাডুবি

মানব পাচারের মূলে দুটি চক্র

জীবিত উদ্ধার ১৪ বাংলাদেশির পরিচয় পাওয়া গেছে

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯

তিউনিশিয়ায় মানবপাচারের মূলে রয়েছে দুটি চক্র। এর একটি চক্রে রয়েছে নোয়াখালীর তিন ভাই। অপরটিতে রয়েছে মাদারীপুরের দুজন। এছাড়া সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরও কিছু দালালও এর সঙ্গে জড়িত।

গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। নৌকা ডুবির ঘটনায় নিখোঁজদের ৩৯ জন এবং জীবিত উদ্ধার হওয়া ১৪ বাংলাদেশির পরিচয় পাওয়া গেছে বলেও তিনি জানান।

দেশের বিভিন্ন জেলায় নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা থেকে ইউরোপে নেয়ার কথা বলে গোপন স্থানে আটকে রাখা হয় বাংলাদেশিদের। পরে জীবননাশের হুমকি দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় মুক্তিপণ। তিউনিসিয়া থেকে পাঠানো বার্তার উদ্ধৃত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৪ যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা নিখোঁজ বাংলাদেশিদের সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছেন। যে চারজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তাদের একজন বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি হলেন- শরীয়তপুর নড়িয়ার গৌতম দাসের ছেলে উত্তম কুমার দাস। ছবি পাঠিয়ে তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে উত্তম কুমারের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি বলেন, উদ্ধার করা ১৪ জনের মধ্যে চারজন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই চারজনের মধ্য দুজনের শরীরের একটি অংশ আগুনে পুড়ে গেছে। এরা তেলের ড্রাম ধরে ভূমধ্যসাগরে সাত থেকে আট ঘণ্টা ভেসে ছিলেন। অন্য দুজন আঘাতের কারণে আহত হয়েছেন। অন্য ১০ জন তিউনিসিয়ার রেড ক্রিসেন্টের আশ্রয়শিবিরে আছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেন, বাংলাদেশের এসব নাগরিক চার থেকে ছয় মাস আগে লিবিয়া গেছেন। তারা দুবাই, শারজা, আলেকজান্দ্রিয়া হয়ে ত্রিপোলিতে পৌঁছান। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে পৌঁছার পর মানবপাচারকারীরা তাদের আটকে রেখেছিল। বিভিন্ন সময়ে তাদের মারধর করে বাংলাদেশের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়েছে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত নোয়াখালীর তিন ভাইয়ের একটি চক্র ও মাদারীপুরের দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বৃহত্তর সিলেট থেকে যারা গেছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা বেশ কিছু দালালকে চিহ্নিত করেছেন। গত বৃহস্পতিবার দুটি নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর হয়ে প্রায় ১৩০ জন ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করেন। এতে অন্তত ১০০ জন ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক। এর মধ্যে একটি নৌকা নিরাপদে পৌঁছে যায় বলে জানা গেছে। অন্যটিতে ৭০ থেকে ৮০ জন ছিলেন। এই নৌকাটি দুর্ঘটনায় পড়ে।

লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নিহত হয়েছেন মাদারীপুরের সদর উপজেলার উত্তর শিরখাড়া গ্রামের সজিব হোসেন এবং শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া গ্রামের জাকির হোসেন। তাদের পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। সজিবদের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তার মা ও বোন ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছেন। মা মোবাইল হাতে নিয়ে বার বার বলছিলেন, তার ছেলে সজিবের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেই পারছেন না সজিব বেঁচে নেই।

সজিবের স্বজনরা জানান, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা না দিয়েই গত ঈদের পরের দিন এক দালালের হাত ধরে সজিব লিবিয়া চলে যান। সেখানে ছয় মাস কাজ করার পরে নোয়াখালীর রুমান নামে এক দালালের খপ্পরে পড়ে। সে আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে সজিবকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে। সজিব রাজি হলে দালাল টাকা নিয়ে সজিবকে লিবিয়ায় জিম্মি দশা করে রাখে। এর চার মাস পরে গত বৃহস্পতিবার অবৈধ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছানোর কথা বলে সজিবকে নৌকায় তোলা হয়। সজিবের বোন মিম আক্তার বলেন, আমারে আফা কইয়া আর কে বোলাবো। আমার ভাইরে এক বছর রাইখা কেন বৃহস্পতিবার পাঠাইলি। আমি এহন কেমনে ভাইরে ভুইলা থাকমুরে। আমি আমার ভাইয়ের না দেখা পর্যন্ত রোজা ভাঙ্গমু না।’

সজিবের সঙ্গে একই নৌকায় ছিলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউনিয়নের শ্রীনদী এলাকার জোবায়ের মাতুব্বরের ছেলে নাদিম মাতুব্বর (১৭) ও বললভদী গ্রামের আদেল উদ্দিন মাতুব্বরের ছেলে মনির হোসেন মাতুব্বর (২২)। এ পর্যন্ত তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এছাড়া একই এলাকার সাইফুল ইসলাম (২৪) ও রাজৈর উপজেলার নাঈম সিকদার (১৯) নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করছে তাদের পরিবার।

নৌকাডুবিতে নিহত হন শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের সেকান্দার হাওলাদারের ছেলে জাকির হোসেন (২৮)। তাকে হারিয়ে এখন দিশেহারা স্ত্রী সন্তানসহ পরিবারের লোকজন। স্বামীকে হারিয়ে কান্না যেন থামছেই না স্ত্রী শান্তা আক্তারের। অবুঝ দুটি কন্যা সন্তানকে সান্ত¡না দেয়ার ভাষা নেই পরিবারের লোকজনের।

জাকির হোসেনের পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে, অর্থ উপার্জনের জন্য নূরইসলাম খলিফা ও নূর-নবী খলিফা নামের দুই দালালের হাত ধরে বিদেশে পারি জমান জাকির হোসেন। জাকিরকে স্থলপথে তুরস্ক নেয়ার কথা থাকলেও দালাল চক্র লিবিয়া নিয়ে জিম্মি করে। লিবিয়ায় জাকিরকে আটকে রেখে পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন সময় টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করলেই ছেলেকে বিক্রি করে দিবে অথবা অনাহারে রাখবে বলে হুমকি দিতে থাকে। এ পর্যন্ত পরিবার প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা দালালচক্রের কাছে দেয়।

এদিকে ছেলে নিহত হওয়াকে বিশ্বাসই করতে পারছে না জাকিরের বাবা-মামা। নিহতদের লাশ দেশে আনার পাশাপাশি নিখোঁজদের ফিরে পেতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। এছাড়াও দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন আত্মীয় স্বজনসহ এলাকাবাসী।

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি মাদারীপুর যুব শাখার প্রধান শিশির হোসেন বলেন, আমরা নিহত ও নিখোঁজদের বাড়িতে গিয়ে তথ্য নিয়েছি। নৌকাডুবিতে নিখোঁজ ২৭ বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। গত সোমবার রেড ক্রিসেন্টের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ব্যক্তিদের পরিচয় জানানো হয়। তারা হলেন নোয়াখালীর চাটখিলের নাসির, গাজীপুরের টঙ্গীর কামরান, শরীয়তপুরের পারভেজ, কামরুন আহমেদ, মাদারীপুরের সজীব, কিশোরগঞ্জের জালাল উদ্দিন ও আল-আমিন; সিলেটের জিল্লুর রহমান, লিমন আহমেদ, আবদুল আজিজ, আহমেদ, জিল্লুর, রফিক, রিপন, আয়াত, আমাজল, কাসিম আহমেদ, খোকন, রুবেল, মনির, বেলাল ও মারুফ; সুনামগঞ্জের মাহবুব, নাদিম ও মাহবুব এবং মৌলভীবাজারের শামিম ও ফাহাদ।