• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪১

অব্যবস্থাপনায়

বিআইডব্লিউটিসির যাত্রী পরিবহন সার্ভিসে বাড়ছে লোকসান

সংবাদ :
  • মাহমুদ আকাশ

| ঢাকা , সোমবার, ০৮ এপ্রিল ২০১৯

image

বাদামতলী ঘাটে ফেলে রাখা হয়েছে বিআইডব্লিউটিসির জাহাজ -সংবাদ

প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)’র যাত্রী পরিবহন সার্ভিস দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনিয়মের কারণে সংস্থার নিজস্ব তত্ত্বাবধানে চলা জাহাজগুলোতে ক্রমেই লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে। জাহাজের জ্বালানি ও ভাড়া আদায়ের টাকা চুরি, সিস্টেমলস এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। একই রুটে বেসরকারি জাহাজগুলো মোটা অংকের টাকা লাভ করলেও এসব কারণে বিআইডব্লিউটিসির জাহাজগুলো থেকে লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, সংস্থার নিজস্ব পরিবহন ওয়াটার বাস, স্টিমার/জাহাজ ও সি-ট্রাক দিয়ে যাত্রী পরিবহন করে থাকে। কিন্তু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি, ভাড়া ও তেল চুরি এবং বেসরকারি জাহাজ মালিকের প্রভাবে সংস্থার যাত্রীসেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ঢাকার চারদিকে নৌপথে চলাচলের জন্য ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করে ওয়াটার বাস। ১১৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় করে ১২টি ওয়াটার বাস চালু করা হয়। কিন্তু‘ যাত্রীর অভাবে এই সার্ভিস এখন বন্ধ। সি-ট্রাক দিয়ে উপকূলীয় এলাকায় যাত্রী পারাপার করা হয়। কিন্তু ১৪টি সি-ট্রাকগুলোর মধ্যে সচল মাছে মাত্র ৬টি। এছাড়া ঢাকা-বরিশাল-মোরেলগঞ্জ নৌ-রুটসহ দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রী পরিবহন শতবর্ষী পুরনো স্টিমারসহ দুইটি নতুন জাহাজ নামানো হয়। ৫৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে এমভি বাঙালি ও এমভি মধুমতি নামে নির্মাণ করা হয়। যাত্রী পরিবহনে এই জাহাজ দু’টি এখন অনিয়মিত সার্ভিস। সপ্তাহে একদিন করে চলাচল করা এই জাহাজ যাত্রীর অভাবে অলসভাবে বসিয়ে রাখা হয় বাদামতলির ঘাটে। তবে সরকারি সংস্থার নৌপথের যাত্রীদের সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিআইডব্লিউটিসি’কে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল মতিন সংবাদকে বলেন, যেকোন দেশে নৌপথের সার্ভিস একটি জনপ্রিয় যাতায়াত মাধ্যম। আমাদের দেশেও নৌ-সার্ভিস একটি জনপ্রিয় সার্ভিস। এক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিসি’র নৌপথের যাত্রী সেবা কিছুটা অপরিকল্পিত। এছাড়া তাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা রয়েছে। ওয়াটার বাস ও স্টিমার সার্ভিসের প্রতি এখনও মানুষের আগ্রহ আছে। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে যাত্রী সেবার মান দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। তাই সরকারি এই সংস্থার প্রশাসনিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো পরামর্শ দেন তিনি।

বিআইডব্লিউটিএ’র সূত্র জানায়, নৌপথের যাত্রীদের উন্নত সেবার অঙ্গীকার নিয়ে এমভি বাঙালি ও এমভি মধুমতি নামের দুটি নতুন জাহাজ নামিয়েছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। ৫৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা এ দুটি জাহাজ পরিচালনায় অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে আয়ের চেয়ে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ। এ কারণে বিলাসবহুল এ দুটি জাহাজ অধিকাংশ সময় বসিয়ে রেখে ঢাকা-মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) রুটে শতবর্ষী পুরনো স্টিমারে কোনভাবে যাত্রী বহন করা হয়। গত ২৯ মার্চ ঢাকা-কলকাতা রুটে জাহাজ সার্ভিসে এমভি মধুমতি চলাচল করায় ওই রুটে একটি জাহাজ চলাচল করছে। এছাড়া উপকূলীয় রুটে চলাচলকারী জাহাজে যাত্রীসেবার মান আরও খারাপ। সংস্থার ১৪টি সি-ট্রাকের মধ্যে ৮টি অচল হয়ে পড়ে আছে। যেগুলো চলছে সেগুলোতে অপরিচ্ছন্নতা ও কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন না যাত্রীরা। আরও খারাপ অবস্থা ওয়াটার বাসের যাত্রীসেবার মান। অব্যবস্থাপনার কারণে এসব নৌযানে যাত্রী উঠছে না। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় এ সংস্থার যাত্রীসেবার মান এক প্রকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ খাতে অব্যাহত লোকসান গুনতে হচ্ছে সংস্থাটিকে। তবে গাড়ি পারাপারকারী ফেরি সার্ভিসে মোটা অংকের টাকা লাভ করছে বিআইডব্লিউটিসি।

সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, নিজস্ব তত্ত্বাবধানে জাহাজ পরিচালনা লোকসান হলেও বেসরকারি ঠিকাদারদের কাছে জাহাজ চার্টারে দেয়া হলে তা আবার লাভের মুখ দেখছে। বর্তমানে যাত্রীবাহী জাহাজ এমভি সোনারগাঁও, ৬টি সি-ট্রাক ও ৮টি ওয়াটার বাস চার্টারে ঠিকাদাররা পরিচালনা করছেন। জাহাজ চার্টারে দেয়া নিয়েও রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান প্রণয় কান্তি বিশ^াস সংবাদকে বলেন, এ সংস্থাটি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। আমরা যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। আগের তুলনায় সংস্থার সেবার মান ভালো হয়েছে। সংস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনিয়ম ও অব্যবস্থপনা দূর করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে সংস্থাটি ইতিবাচক ধারায় আনতে চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাঙালি জাহাজের সারোয়ার নামের এক যাত্রী বলেন, বিআইডব্লিউটিসির যাত্রার পদে পদে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। ঢাকা-বরিশাল রুটের জাহাজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ছাড়ে। জ্বালানি খরচ বাঁচাতে ধীরগতিতে জাহাজ চালানোর কারণে পরদিন সকাল ৬-৭টায় গন্তব্যে পৌঁছে। অর্থাৎ ঢাকা-বরিশাল যাতায়াতে ১২-১৩ ঘণ্টা সময় লাগে। সরকারি এ সংস্থার জাহাজটি সদরঘাটের শেষ প্রান্তে ভিড়ানো থাকে। যাত্রীদের অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে জাহাজে চড়তে হয়। জাহাজের টয়লেট ও চলাচলের পথও পরিষ্কার থাকে না। জাহাজের কর্মচারীরা যাত্রীসেবায় আন্তরিক নয়। পক্ষান্তরে বেসরকারি জাহাজগুলো ঢাকা থেকে রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টায় ছাড়ে। ভোররাত ৪টা-৫টায় বরিশাল পৌঁছে। এসব জাহাজের সেবার মানও ভালো। এ কারণে যাত্রীরা সরকারি জাহাজে চড়তে আগ্রহী হয় না।

বিআইডব্লিউটিসি’র সূত্র জানায়, ২৬ কোটি ৯৫ লাখ ২৭ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এমভি বাঙালি জাহাজ ২০১৪ সালে যাত্রীসেবায় নিয়োজিত করা হয়। চালুর পরই জাহাজটিতে ত্রুটি ধরা পড়ে। জাহাজটিতে অতিমাত্রায় কম্পন দেখা দেয়। বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় ভেতরে খুব গরম অনুভূত হতে থাকে। বিষয়টি নৌ-মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়ালে পরে তা মোডিফিকেশন করা হয়। ওই কাজ করাতে ৫ মাস সময় জাহাজ পড়েছিল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডে। এখনও জাহাজ চলাচলের সময় কম্পন হয় বলে জাহাজের কর্মচারীরা জানিয়েছেন। সংস্থার অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এ পর্যন্ত তিনবার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে জাহাজটি। ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জাহাজটি মেরামতে ব্যয় হয়েছে ১৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা। সংস্থার এক হিসাবে দেখা গেছে, গত জুলাই পর্যন্ত এ জাহাজটিতে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ ৯ হাজার ৮২৩ টাকা। এর বিপরীতে পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৭০ লাখ ১২ হাজার ৪০৯ টাকা। এ পর্যন্ত জাহাজটি চালিয়ে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হয়েছে তিন কোটি ২০ লাখ টাকা। অপরদিকে ২৬ কোটি ৫৮ লাখ ৫২ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এমভি মধুমতি জাহাজ ২০১৫ সালে উদ্বোধন করা হয়। জাহাজটি থেকে এ পর্যন্ত ২ কোটি ৬২ লাখ ৫ হাজার ৭৬০ টাকা আয় হয়েছে। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৫১ লাখ ২৯ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ আয়ের প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় হয়েছে। অব্যাহত লোকসানের মুখে মাসে মাত্র চারটি করে রাউন্ডট্রিপ দিচ্ছে জাহাজ দুটি। বাকি সময় বসিয়ে রাখা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শতবর্ষী পুরনো ৪টি প্যাডেল স্টিমার দিয়েই যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। ওইসব জাহাজে কেবিন ও যাত্রীধারণ ক্ষমতাও কম। বাঙালি ও মধুমতি জাহাজ চার্টারে দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে সংস্থাটি।

জানা গেছে, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা ও সিস্টেমলসের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংস্থার রকেট সার্ভিসে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৬ কোটি ৭৩ লাখ ১৪ হাজার টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ৯৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। এর আগে এমভি সোনারগাঁও জাহাজ কেনা ও মেরামতেও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। ওই জাহাজটিতে যাত্রীপরিবহন বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে এটি প্রমোদতরী হিসেবে চার্টারে দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-হাতিয়াসহ উপকূলীয় রুটগুলোতে বিআইডব্লিউটিসির জাহাজই নিরাপদ বাহন। অথচ নানা অজুহাতে ওইসব রুটে বিআইডব্লিউটিসির জাহাজ চলাচল করে না। এ সুযোগে স্থানীয়ভাবে ট্রলারে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রীবহন করা হয়। উপকূলীয় রুটের চারটি জাহাজের মধ্যে বর্তমানে তিনটি সচল রয়েছে। একটি মেরামতাধীন রয়েছে। ১৪টি সি-ট্রাকের মধ্যে ৮টি অচল অবস্থায় মেরামতে রয়েছে। দুটি সম্প্রতি মেরামত শেষ করে যাত্রী পরিবহনে নামানো হয়েছে। ১৪টি সি-ট্রাকের মধ্যে ৬টি সি-ট্রাক বেসরকারি ঠিকাদারদের কাছে চার্টার দেয়া হয়েছে। এদিকে ইজারা দেয়া ৮টি বাসের মধ্যে ৭টি ওয়াটার বাসেই সদরঘাটের বাদামতলী ঘাটে অলসভাবে ফেলে রাখা হয়েছে। শুধু একটি ওয়াটার বাস সদরঘাট থেকে গাবতলী রুটে চলাচল করলেও যাত্রী সংকটের কারণে তা অনিয়মিত বলে যাত্রীরা জানান।

আগে ওয়াটার বাসে যাতায়াত করত সদরঘাট-গাবতলী রুটের কামাল হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, সড়ক পথে সদরঘাট থেকে গাবতলীতে যেতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগে। সঙ্গে রয়েছে যানজটের ভোগান্তি। তাই ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করে ওয়াটার বাসে যেতে পারলেই আরামের জার্নি। কিন্তু ওয়াটার বাস সার্ভিসটি নিয়মিত নয়। সকালের ওয়াটার বাস ছাড়ে দুপুরে। আরও যাত্রী কম থাকলে বিকেলের ওয়াটার বাস ছাড়ে না। তাই অনেক যাত্রী ওয়াটার বাসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। এছাড়া ওয়াটার বাসটি রাখা হয় সদরঘাটের বাদামতলির ঘাটের। এখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত করতে কষ্ট হয়। কারণ ওয়াটার বাসের ঘাটে আসার রাস্তার দুই পাশে অবৈধ স্থাপনা ও দোকান পাটের কারণে দীর্ঘ যানজট অতিক্রম করে ঘাটের আসতে হয়। তাই অনেক যাত্রী বাদামতলী ওয়াটার বাস ল্যান্ডিন স্টেশনে আসতে চায় না। ফলে বাসে যাতায়াত করে যাত্রীরা।