• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১১ বৈশাখ ১৪২৫, ১৭ শাবান ১৪৪০

শামীম ও নুর উদ্দিনের জবানবন্দি

নুসরাত হত্যার দায় স্বীকার

হুকুম দেয় অধ্যক্ষ সিরাজ

সংবাদ :
  • প্রতিনিধি, ফেনী

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৯

image

সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে মামলার এজাহারভুক্ত ২ নম্বর আসামি নুর উদ্দিন ও ৩ নম্বর আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম। গত রোববার দুপুর আড়াইটা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

রোববার রাত ১টার পর পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন) তাহেরুল হক চৌহান আসামি দু’জন আদালতের কাছে তাদের স্বীকারোক্তি উপস্থাপন করেছে জানিয়ে বলেন, তারা পুরো বিষয়টি খোলাসা করেছে। একেবারে কিভাবে হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে, কারা ঘটিয়েছে, কোন আঙ্গিকে ঘটিয়েছে, বিষয়গুলো উঠে এসেছে। দ্রুত আপনারা বিস্তারিত জানবেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, তারা (নুর ও শামীম) অপরাধ স্বীকার করেছেন, হত্যাকান্ড তারা ঘটিয়েছেন। এখানে কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ছিল, পরিকল্পনায় অংশ নিয়েছে। কারাগারে বন্দী হত্যা মামলার প্রধান আসামি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা থেকে তারা হুকুম পেয়েছেন। এই বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিবরণ এসেছে।

রোববার বিকেল সাড়ে ৩টায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া শুরু করেন আসামি নুর উদ্দিন। রাত সাড়ে ৯টায় তার জবানবন্দি নেয়া শেষ হয়। নুর উদ্দিনের পর মামলার আরেক আসামি শাহাদাত হোসেন শামীমের জবানবন্দি রেকর্ড করা শুরু হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানিয়েছে, নুর উদ্দিনের বক্তব্যের সমর্থনেই জবানবন্দি দিয়েছেন শাহাদাত হোসেন শামীম। রোববার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে এই দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।

পিবিআই কর্মকর্তা আরও জানান, দীর্ঘ সময় ধরে দেয়া জবানবন্দিতে হত্যাকান্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক তথ্য উঠে এসেছে। তবে অন্য আসামিদের গ্রেফতার ও তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। অবশ্য পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে বলে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, পিবিআই এ মামলার দায়িত্ব পাওয়ার চার দিনের মধ্যে (১০-১৪ এপ্রিল) আমরা ঘটনার মূল নায়ক, যারা ঘটিয়েছে, তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করেছি। তদন্তকারী কর্মকর্তা আইনের মধ্যে থেকে আদালতের কাছে তাদের হাজির করেছেন। আদালত দীর্ঘ সময় ধরে তাদের সিআরপিসির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।

হত্যাকান্ডের সম্পৃক্ততার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তাহেরুল হক চৌহান বলেন, এখন পর্যন্ত ১৪ জনের কথা বলা হচ্ছে। আরও কিছু নাম বিচ্ছিন্নভাবে এসেছে। আমরা সেসব যাচাই-নিরীক্ষা করব। যে চারজন আগুন দিয়ে নুসরাতকে পুড়িয়েছে তারা গ্রেফতার আছে কি-না, জানতে চাইলে পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা দুইজনকে গ্রেফতার করেছি। বাকি দুইজনকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। খুব শীঘ্রই ভালো খবর পাবেন।

জবানবন্দিতে নুর উদ্দিন জানায়, গত ৪ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে ফেনী কারাগারে দেখা করে সে, শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরও কয়েকজন। তারা ‘আলেম সমাজকে হেয় করায়’ সিরাজ উদ দৌলার কাছে নুসরাতকে ‘একটা কঠিন সাজা দেয়ার ব্যাপারে হুকুম চায়’। ওই সময় শামীম নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয়। তখন এ প্রস্তাবে সায় দিয়ে সিরাজ উদ দৌলা তাদের হুকুম দেয়, করো। তোমরা কিছু একটা করো। একইসঙ্গে সিরাজ উদ দৌলা এ নিয়ে ‘বেশ কিছু গোপন টিপস’ দেয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করে নুর উদ্দিন।

জবানবন্দিতে নুর উদ্দিন আরও জানায়, নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ব্যাপারে শামীমের বেশি উৎসাহ ছিল। কারণ সে দীর্ঘদিন ধরে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আসছিল। নুর উদ্দিন জানায়, সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশনা পাওয়ার পর গত ৫ এপ্রিল সে, শামীম, জাবেদ হোসেন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরও কয়েকজন মাদ্রাসার পাশের পশ্চিম হোস্টেলে বৈঠকে বসে। সেই বৈঠকে নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যাপারে বিস্তারিত পরিকল্পনা নেয়া হয়, যা ৬ এপ্রিল তারা বাস্তবায়ন করে।

নুসরাতের প্রতি নিজের ক্ষোভ থাকার কথা উল্লেখ করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে শাহাদাত হোসেন শামীম বলেছে, দেড় মাস আগেও সে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু নুসরাত তা প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি অপমানও করে। এ কারণে সে নিজেও নুসরাতের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল। যার ফলে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে হত্যাকান্ডে অংশ নেয়। জবানবন্দিতে শামীম জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে তারা মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে থাকা টয়লেটে ওঁৎপেতে থাকে। এর আগে এক নারী সহযোগীকে দিয়ে তারা তিনটি বোরকা ও কেরোসিনের ব্যবস্থা করে। আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে তারা উম্মে সুলতানা পপিকে দিয়ে কৌশলে নুসরাতকে ছাদে নিয়ে আসে। এরপর নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। শামীম জানায়, এ ঘটনার সময় নুর উদ্দিন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরও পাঁচজন গেটে পাহারায় ছিল। নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর শামীম দৌড়ে নিচে নেমে উত্তর দিকের প্রাচীর টপকে বের হয়ে যায়। বাইরে গিয়ে সে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে ফোনে বিষয়টি জানায়। রুহুল আমিন বলে, আমি জানি। তোমরা চলে যাও।

এর আগে শুক্রবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই প্রধান ঢাকায় বলেছেন, দুটি কারণে নুসরাতকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এক. শ্লীলতাহানির মামলা করে অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করিয়ে নুসরাত আলেম সমাজকে ‘হেয়’ করেছেন। দুই. আসামি শাহাদাত নুসরাতকে বারবার প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু নুসরাত তা গ্রহণ না করায় শাহাদাতও হত্যার পরিকল্পনায় যুক্ত হয়। পিবিআই বলছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ এজাহারভুক্ত সাতজন গ্রেফতার হয়েছে। গ্রেফতারের বাইরে আছে এজাহারভুক্ত ৭নং আসামি।

এর আগে আলোচিত এ মামলায় প্রধান দুই আসামি নুর উদ্দিনকে ১১ এপ্রিল রাতে ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে এবং পরদিন ১২ এপ্রিল সকালে উক্ত জেলার মুক্তাগাছা থেকে শাহাদাত হোসেন শামীমকে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলায় গতকাল পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ছয়জন এবং এজাহারবহির্ভূত সাতজন রয়েছেন। এই মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ১১ জন আসামি পুলিশের রিমান্ডে রয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত ২৭ মার্চ ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ নুসরাত জাহান রাফিকে শ্লীলতাহানি করার অভিযোগে জেলে যায়। পরে জেলে থেকেই সিরাজ রাফিকে হত্যার নির্দেশ দিলে ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষার আগমুহূর্তে মুখোশধারী চার-পাঁচজন দুর্বৃত্ত পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টা চালায়। রাফি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান রাফি।