• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ৯ কার্তিক ১৪২৭, ৭ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

সাক্ষাৎকার

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

image

গতকাল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নাটক ‘দেবী’ মঞ্চস্ত করেছে বুহবচন। দলের অধিকর্তা এবং মঞ্চের মিসির আলী খ্যাত অভিনেতা তৌফিকুর রহমান এ নিয়ে কথা বলেছেন...

হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ আয়োজন নিয়ে বলেন-

হুমায়ূন আহমেদের ৭১তম জন্মদিনকে আমরা উদযাপন করেছি ‘দেবী’ নাটক মঞ্চায়নের মধ্যে দিয়ে। সম্প্রতি আমি মঞ্চে দুটি বায়োগ্রাফি আশ্রিত নাটক দেখলাম। শেখ সাদী এবং কালিদাস। দেখলাম কবিদ্বয়ের জীবনী গ্রন্থ সেভাবে পাওয়া না গেলেও তাদের রচিত গ্রন্থগুলো পাওয়া যায়। চারিদিকে এত যে প্রচার-প্রচারণা, নিজের ঢাকে নিজেরই ঢোল পেটানোর তাড়না সেসবই কি দীর্ঘকাল টিকে থাকবে? আসলে কর্মই মানুষকে অমরত্ব পাইয়ে দেয়। বাংলাদেশের হুমায়ূন আহমদের জাদুকরী লেখা দিয়ে যেভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপড়েন, হাসি-কান্না, চাওয়া-পাওয়া, সমাজ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন তা এক কথায় নান্দনিক এবং অনবদ্য। হিমু চরিত্রের বিবাগীমন আর মিসির আলী চরিত্রের যৌক্তিকতায় নিমগ্ন এমন মানুষ শুধু বাংলাদেশে কেন বিশ্বের অনেক দেশে প্রবাসী বাঙালির ভিড়ে দেখা মিলবে। ফলে হুমায়ূন আহমেদ সশরীরে আজ আমাদের মধ্যে না থাকলেও তিনি জীবন্ত তার সৃজিত কর্মের মধ্যে দিয়ে। আমরা নাটকের মানুষ, নাটক মঞ্চায়নের মধ্যে দিয়েই হুমায়ুন আহমদকে স্মরণ করব, শ্রদ্ধা জানাব।

নন্দিত নরকে এবং দেবী মঞ্চায়ন প্রসঙ্গে বলুন

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে মঞ্চ মাধ্যমে পথচলায় নাট্যদল বহুবচন সংগত কারণে গৌরবের অংশীদার। ১৯৭৫ সালের শেষ নাগাদ আমরাই মঞ্চে আনি ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাস অবলম্বনে নাট্য প্রযোজনা। উপন্যাস থেকে নাট্যরূপের জটিল কর্মটি কীভাবে করা হবে প্রশ্নে হুমায়ূন আহমদের সমাধান ছিলো, ‘জাফর ইকবালকে বলে দেব, ও-ই নাট্যরূপ দেবে’। সত্যি সত্যি তখন আমরা ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের নাট্যরূপে নাটকটি মঞ্চে আনি। নারী হৃদয়ের রক্তক্ষরণের এই নাটকটি একদিকে যেমন দর্শকপ্রিয়তা পায় অন্যদিকে আমরা ধারাবাহিকভাবে অনেক প্রদর্শনী করতে পারি। এরপর আমরা দলীয় ভাবে সিদ্ধান্ত নিই, হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘দেবী’ মঞ্চায়ন করব। একদিন আমরা লেখকের গ্রিনরোডের বাসায় হাজির। আমাদের চাওয়ার বিপরীতে তার অভিব্যক্তি ছিল প্রাণবন্ত, নান্দনিক ও অকৃত্রিম। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার নাটক লেখার অনুপ্রেরণা তো বহুবচন। আমার যে কোন নাটক আপনারা নাট্যরূপ দিয়ে মঞ্চস্থ করতে পারেন। আপনাদের প্রতি আমার বিশ্বাস আছে।’ এরপর আমাদের দলে এক সময়ের সভাপতি ও আজীবনের নাট্যকর্মী বন্ধু মো. ইকবাল হোসেনের নাট্যরূপে আর আরহাম আলোর নির্দেশনায়, দেড় বছরের মহড়া শেষে ১৯৯৪ সালে মঞ্চে আসে ‘দেবী’। এটি দেশ ও কলকাতায় নাট্যানুরাগী এবং নাট্যবোদ্ধাদের কাছে বহুল প্রশংসিত প্রযোজনা। ২৫ বছর ধরে এটি মঞ্চায়ন হচ্ছে।

দেবী নাটকের কাহিনী যদি সংক্ষেপে বলেন।

দেবী এক রানু নামের ষোলো-সতেরো বছর বয়সী কিশোরীর মনের চেতন এবং অবচেতন মনের দ্বন্দ্বের গল্প। একদিকে রানুর মনোজগতে দেবীর উপস্থিতি অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মিসির আলীর যৌক্তিক বাস্তব ব্যাখ্যার মধ্যে দিয়ে তৃতীয় মাত্রার আত্মোপলব্ধির নাটক দেবী। রানুকে নিয়ে রহস্য আবার রহস্যের উন্মোচন শেষে নতুন রহস্যের অবতারণা একদমই হুমায়ূন আহমদের রচনার অতি আশ্চর্য কৌশল।

নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমেই হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করব

মিসির আলী চরিত্রের সঙ্গে আপনার বোঝাপড়া কেমন?

নটর ডেম কলেজ কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় থেকেই আমার নাটকে অভিনয়। আবদুল্লাহ আল মামুন, মমতাজ উদ্দীন আহমেদ, মনোজ মিত্র, চন্দন সেন প্রভৃতি নাট্যকারদের রচিত নাটকের মূখ্য চরিত্র রূপায়ন করেছি মঞ্চায়নের ধাপে ধাপে। তবে অভিনয় উপস্থাপনায় আমার কাছে আকৃষ্টের, অনুসরণের এবং অনুকরণের ছিল অভিনেতা উৎপল দত্ত। তার স্পষ্ট উচ্চারণ, সংলাপের রসাস্বাদন, প্রয়োগের সময় জ্ঞান, দৃষ্টি ক্ষীপ্রতা, সহশিল্পীর প্রতি সহযোগিতা প্রভৃতি আমার সব সময়ইয় ভালো লাগত এবং স্মৃতিতে এখনও ভালো লাগে। ফলে মিসির আলী চরিত্র রূপায়নে একদিকে আমি বিবেচনায় রাখি হুমায়ূন আহমেদের দৃষ্টিভঙ্গি অপর দিকে উৎপল দত্ত আশ্রিত আমার অভিনয় আঙ্গিক। ফলে মিসির আলী চরিত্রের সঙ্গে আমার বোঝাপড়া শ্রদ্ধার, আত্মস্থ করবার সাধনার এবং উপস্থাপন করবার তীব্র ব্যাকুলতার। আর এই অভিনয় পরিক্রমায় সদাই আমার সহযাত্রী, সহমর্মী এবং গুনগ্রাহী আমার স্ত্রী শারমিনা তৌফিক যিনি উইংস এর আড়ালে দাড়িয়ে আমার অন্তরাত্মার প্রেরণা।

বহুবচন নিয়ে আপনার ভাবনা

দেখুন সবে দেশ স্বাধীন হলো। রণাঙ্গনের পালা সাঙ্গ হলো। এবার ভাঙা দেশটাকে গড়ে তোলার পালা। মতিঝিল নিপুণা পেট্রলপাম্পে দিনের পর দিন আড্ডা চলতো। অবশেষে সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম নাটক করব। সেলিম, মোতাহার, আরমান, বিন হক, নওশাদ, ঝিনু, মাজহার, বিপ্লব, দুলাল, দুলু আর আমি মিলে কণ্ঠে তুলে নিলাম এ স্লোগান- ‘আমাদের নাটক মানে শুধু নাটকীয়তা নয়, নাটকের চিরাচরিত আঙ্গিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ’। দলের নাম রাখা হলো বহুবচন। ‘প্রজাপতির লীলালাস্য’ নাটক দিয়ে আমাদের দলীয় যাত্রা শুরু, সে দলীয় যাত্রায় ৪৩ বছরে ২২টি নাটক প্রযোজনা করা হয়েছে। চলতি পথ কখনও দ্রুত ধাবমান, কখনও ছিলো ধীরলয়। শেষাবধি বহুবচন কখনও মঞ্চ ছাড়েনি, ছাড়বেও না। এ অনুকূল-প্রতিকূল উভয় অবস্থায় বহুবচন বিকশিত হয়েছে আবার নান্দনিকতা অক্ষুণ্ন রেখে প্রকাশিত হয়েছে। এটাই আমাদের আনন্দ ও গর্ব। সামনে নতুন নাটক নিয়ে নতুন গতিতে এগিয়ে চলবে বহুবচনের পথচলা।