• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪১

সুশিক্ষার অভাবে কুসংস্কারে আটকে আদিবাসীরা : ভরসা ওঝা কবিরাজে

সংবাদ :
  • জেলা বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী

| ঢাকা , সোমবার, ০৮ এপ্রিল ২০১৯

একেবারে প্রত্যন্তঞ্চলের একটি গ্রাম। রাত প্রায় সাড়ে ৮টা। রাস্তার পাশ ঘেষে বসে আছে কয়েকজন ওঝা। সামনে একটি যুবক উপড় হয়ে শুয়ে রয়েছে খেজুর পাতার পাটিতে। উপড় হয়ে থাকা যুবকের মাজার ওপরে বসে দুই হাত দিয়ে নাড়ছে এক ওঝাঁ। আর পাশে বসা অন্য এক ওঝাঁ হাতে হাসুয়া দিয়ে মাটিতে এক এক করে কাটাচ্ছে আর মন্ত্রপাঠ করছেন। এভাবে প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলল প্রথম পর্বে চিকিৎসা।

এখানের শেষ নয়, প্রথম পর্ব শেষে যুবককে পুনোরায় তুলে এক পা সামনে দিয়ে বসানো হলো মাটিতে। তাকে ঘিরে দুই পাসে চারজন করে আটজন বসছেন ওঝার দল। সবার হাতে একটি করে রয়েছে নিমপাতার ডাল। শুর হলো ঝাড়া-ফু। আর গানের তালে তালে ঘুরাচ্ছে নিমপাতা। চললো ঘণ্টা ব্যাপি।

অসুস্থ ব্যাক্তিকে অপ-চিকিৎসার এমন দৃশ্য বুধবার দেখা মিললো রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা এলাকার প্রত্যন্তঞ্চলের ঝলঝলিয়া ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী গ্রামে। এ গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ যে কোন অসুখ হলে হাসপাতাল নয়,তারা চিকিৎসা নেন ওঝা বা কবিরাজের কাছে।

ওঝার চিকিৎসা নেয়া সেই আদিবাসী যুবকের নাম পরেশ টুডু (৩৫)। একই গ্রামে বাড়ি তার। সেখানে চিকিৎসা শেষে কথা হয় তার সঙ্গে।

পরেশ টুডু জানান,কয়দিন ধরে তার মাজায় ব্যথার কারণে ঠিকমত কাজকর্ম করতে পারছিলেন না। তাই গ্রামের কবিরাজ দিয়ে মাজা ঝেড়ে নিচ্ছেলেন। চিকিৎসকের কাছে যাননি কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,ওষুধ খেয়ে অসুখ ভাল হয়না। টাকাও খরচ বেশি, তাই অল্প খরচে কবিরাজের চিকিৎসাই আমাদের সকল অসুখ ভাল হয়ে যায়।

সেই দিন ঝাড়া-ফু দিচ্ছেলেন, সোম, মহ, সুরেন, লালসহ ৮ জন ওঝার দল। কথা হয় তাদের সঙ্গে। তারা জানান,দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে আমরা গ্রামের মানুষদের চিকিৎসা দিয়ে আসছি। এ জন্য টাকার কোন চাহিদা নেই আমাদের। ভাল হলে খুশি মনে যে যা পারে দেন মাত্র। তারা আরও বলেন, সাপে কাটা, জ্বীনের আছর, মাজা ব্যথাসহ নানা রকম চিকিৎসা দিয়ে থাকি আমরা।

এমন অপচিকিৎসা থেকে বের হতে এখনও পারেনি শুধু তানোর উপজেলার ঝলঝলিয়া গ্রামেই নয়,বরেন্দ্র অঞ্চলের সমাতল আদিবসি বা ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর অনেক পরিবার। সামন্য জ্বর-সদ্দি-কাশি, মাজা ব্যথা, মাথা ঘোরা, মুখে ঘা ইত্যাদি অসুখ হলেই কোন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল নয়, প্রথমেই তারা ওঝার কাছে ছুটে যাই অপচিকিৎসা নিতে।

এ বিষয়ে মুন্ডুমালা মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক সুনিল কুমার মাঝী বলেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উপজেলা,ইউনিয়নও গ্রামের অনেক স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। তবুও আদিবাসি(সাওতাল)ক্ষুদ নৃগোষ্ঠীর অনেক পরিবার কুসংস্কার থেকে বের হতে না পারাই তারা হাসপাতালে না গিয়ে গ্রামের ওঝাঁ বা কবিরাজের কাছে সব রকম চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে।

এর কারণ হিসাবে তিনি বলেন, অনেক আদিবাসি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারগুলোর ধারণা বা এখনও বিশ্বাস করেন এমন সব অসুখ-জ্বীনের আসর অথবা খারাপ দেবতার ভরের কারণে হয়ে থাকে।

অনেক আদিবাসী পল্লীগুলোতে শিক্ষার হার কম রয়েছে। এসব গ্রামে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে মানুষগুলোকে সচেতনমূলক প্রচারণা চালাতে হয়ত বা তারা কবিরাজ নয়, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাবে।

রাজশাহীর তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ডা. দুরুল হোদা বলেন, কুসংস্কারে বিশ্বাসী অনেক মানুষ এখনও রয়েছে। কবিরাজি চিকিৎসা বিজ্ঞান বিশ্বাস করেন না। যে ব্যক্তির মাজায় ব্যথা হলো সে কবিরাজের ঝাড়া-ফু দিয়ে কি সারবে। জনসচেতনতার অভাবে মানুষ এখান থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না।

ডা. দুরুল হোদা আরো বলেন, অনেক শিক্ষিত মানুষেরাও হাতক-পা ভেঙ্গে গেলে কবিরাজের কাছে ছুটে যান। তাদের গাছের ওষুধ বেধে ঘুরে বেড়ান। একমাস পরে ছবি তোলে দেখা যায় হাড় জোড়া লাগেনি। আসলে এটা একটি অপ-চিকিৎসা। এটি বন্ধ করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে গরিব-ধনী সবার জন্য সমান চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বেনা মূল্যে ওষুধ দেয়া হয়। কবিরাজ বা ওঝাঁর কাছে না গিয়ে সবাইকে হাসপাতালমুখী হওয়ার আহ্বান জানান এ চিকিৎসক।