• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

মাদারগঞ্জে কর্মসৃজন প্রকল্পের টাকা হরিলুটের অভিযোগ

সংবাদ :
  • প্রতিনিধি, জামালপুর

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯

জামালপুরের মাদারগঞ্জে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের অতিদরিদ্রদের জন্য চল্লিশ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচী প্রকল্প বাস্তবায়নে ইউপি চেয়ারম্যান, প্রকল্পের সভাপতি ও ব্যাংক ম্যনেজারদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে কোটি টাকার মজুরি থেকে হাজারও শ্রমিক বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দ্বিতীয় দফায় অতিদরিদ্রদের জন্য চল্লিশ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উপজেলার ৭ ইউনিয়নের ৩ হাজার ৩শ’ ৯৩ জন শ্রমিকের মজুরি বাবদ ২ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, সর্দার মজুরি ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা, নন ওয়েজ কস্ট ১৪ লাখ ৪১ হাজার ১শ’ ৫৯ টাকাসহ মোট ২ কোটি ৮৭ লাখ ১১ হাজার ১শ’ ৫৯ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রথম দফাতেও একই অঙ্কের টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। সব মিলিয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫ কোটি ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৩শ’ ১৭ টাকা এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অতিদরিদ্র নারী-পুরুষ শ্রমিকদের দিয়ে এই প্রকল্পের কাজ মাটি দ্বারা কাঁচা সড়ক কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ ভরাটের নিয়ম থাকলেও ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলার হাজারও শ্রমিকের মজুরি লুটপাট হয়েছে। গত এক সপ্তাহ সরেজমিনে উপজেলার ৩নং গুনারীতলা ইউনিয়নের ৪টি ওয়ার্ডের তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের কাছে খোঁজ নিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। গুনারীতলা ইউনিয়নের ৫নং মোসলেমাবাদ ওয়ার্ডের নুরেজা বেগম, তার স্বামী বাদশা মিয়া, ফকির মোল্লা, মর্জিনা বেগমসহ ৩০ জন, ১নং ওয়ার্ডের চরগোপালপুর গ্রামের হাফিজুর রহমান, হামেদ আলীসহ ২০ জন, ৩নং ওয়ার্ডের ফরহাদ মিয়া, তার ভাই জাহাঙ্গীর গোলেছা বেগমসহ অন্যরা এ অনিয়মের কথা জানান।

কোনদিনই তারা মাটির কাটার কাজ করেননি। অথচ তাদের নামে ব্যাংকের জমাকৃত টাকা উত্তোলন করে তা আত্মসাত করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, শুধু ২০১৮-১৯ অর্থবছরই নয় ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে এই ইউনিয়নের ৫ শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিকের নাম ইউজিপিপির তালিকাভুক্ত করে ইউপি চেয়ারম্যান ও কতিপয় ইউপি সদস্য প্রতিবছর প্রতিজন শ্রমিকের ১৬ হাজার টাকা মজুরি ভুয়া টিপসহি দিয়ে তাদের ব্যাংক হিসাব থেকে উত্তোলন করে আত্মসাত করেছেন।

ইজিপিপির নিয়মানুযায়ী তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলার পর প্রতি শ্রমিকের হিসেবে মজুরির টাকা জমা করা হয়। প্রতি সপ্তাহের ৫ দিন কাজ শেষে তাদের কাছে থাকা চেকের মাধ্যমে মজুরি উত্তোলন করার কথা। কিন্তু এসব শ্রমিকের কাছে কোন চেক বই দেয়া হয়নি। এমনকি টাকা উত্তোলনের সময় তাদের কাছ থেকে কোন টিপ সহি বা স্বাক্ষর নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ মজুরি বঞ্চিত এসব অতিদরিদ্র নারী-পুরুষ শ্রমিকদের। অথচ ব্যাংক থেকে তাদেরই নামে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংক, মাদারগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. শহিদুল ইসলামের কাছে ইজিপিপির তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের নামে খোলা হিসাব থেকে কিভাবে কে এসব টাকা উত্তোলন করেছেন জানতে চাইলে ব্যাংক থেকে শ্রমিকরা টাকা না নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, গুনারীতলা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য মোসলেমাবাদ ও নুরুন্নাহার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাট প্রকল্পের সভাপতি ইমরান খান বাছেদ শ্রমিকদের মাঝে শ্রমিকদের ব্যাংকে জমাকৃত টাকা সুষ্ঠুভাবে বন্টনের জন্য লিখিত দিয়ে তিন দফায় শ্রমিকদের মজুরি ও সঞ্চয়ের ৪২ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন।

তবে ব্যাংক ম্যানেজারের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে মাদারগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবাযন কর্মকর্তা জাহিদ হাসান এই প্রতিবেদককে বলেন, শ্রমিক ব্যতীত অন্য কারও কাছে টাকা দেয়ার নিয়ম নেই। প্রতিজন শ্রমিকের ব্যাংক হিসাবে মজুরির টাকা জমা এবং ব্যাংক থেকে তাদের নামে চেক প্রদান করা হয়েছে। হিসাবধারী শ্রমিকরাই তাদের টাকা উত্তোলন করবেন। যদি এর ব্যত্যয় ঘটে এবং অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রকল্প সভাপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্পের সভাপতি ও গুনারীতলা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য ইমরান খান বাছেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, তিনি নামেমাত্র প্রকল্পের সভাপতি প্রকল্পের কাজ ও শ্রমিকের তালিকা ও মজুরি প্রদানসহ সব কিছু চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন আয়না করেছেন।

গুনারীতলা ইউনিয়নের চেযারম্যান জয়নাল আবেদীন আয়না বলেন, শ্রমিকদের মজুরি দেয়া হয়েছে। মাস্টার রোলে তাদের টিপ সহি রয়েছে। কিছু শ্রমিক অস্বীকার করতে পারেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ।

অপরদিকে দুই দফায় ৮০ দিনে ২ হাজার টাকা করে সঞ্চয়ের টাকা হিসাবধারীদের হিসাবে ৬৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা জমা রাখা হয়। বছর শেষে প্রতি জুলাই মাসে এসব টাকা শ্রমিকদেরই উত্তোলন করার কথা থাকলেও ব্যাংক ব্যবস্থাপকদের যোগসাজশে প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যানরা প্রকল্পের সভাপতিদের দিয়ে তা উত্তোলন করে নিজেরাই আত্মসাত করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সোনালী ব্যাংক মাদারগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের পক্ষে প্রকল্পের সভাপতি এককালীন টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন।

এই চিত্র শুধু গুনারীতলা ইউনিয়নই নয়। পুরো উপজেলার ইজিপিপির চিত্র।