• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

বালু ব্যবসায়ীরা বে-প-রো-য়া পাল্টাচ্ছে চুনারুঘাটের ভূ-প্রকৃতি

সংবাদ :
  • খন্দকার আলাউদ্দিন, চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ)

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

image

চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) : সড়ক দখল করে এভাবেই চলছে বালু ব্যবসা। এর ফলে সড়কে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা -সংবাদ

বালু বহনকারী বেপরোয়া গতির ট্রাক্টরে গ্রামীণ সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রশাসন থেকে বার বার ড্রেজার মেশিন ধ্বংস, শাস্তি ও জরিমান করা সত্ত্বেও থেমে নেই বালু খেকোরা। ইজারার শর্তানুযায়ী ইজারাকৃত নির্দিষ্ট ঘাট ব্যতীত অন্য যে কোনো স্থানে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ। কিন্তু উত্তোলনকৃত বালু আবার যততত্র রাস্তার পাশে ডিপু বসিয়ে লোড আনলোড করা হচ্ছে। এতে করে একদিকে যেমন জনসাধারণের যাতায়তের সমস্যা হচ্ছে, অন্যদিকে ধুলা-বালুতে পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে।

সিলিকা বালিসমৃদ্ধ চুনারুঘাট উপজেলার মানচিত্র খেয়ে ফেলছে বালু খেকোরা। দীর্ঘদিন যাবত বালু উত্তোলনের ফলে বদলে যাচ্ছে এ উপজেলার মানচিত্র। ছোট ছোট খাল ছড়ায় রূপান্তরিত হচ্ছে। ছড়া রূপ নিচ্ছে নদীতে। নদীগুলো ভেঙ্গে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিগত ১০ বছর ধরে নদী, ছড়া, চা বাগান থেকে অবাধে বালু পাচার করার কারণে পুরো চুনারুঘাটের চিত্রই পাল্টে গেছে এখন। বালু উত্তোলনের কারণে কতিপয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে গেলেও সাধারণ মানুষজন পড়েছেন বিপাকে। চা বাগান, বিভিন্ন সড়কে নির্মিত পুল-কালভার্ট, সেতু, সড়ক-মহাসড়ক ভেঙে পড়ছে একর পর এক। ব্রিজের নিচ থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে চলতি বছর দু’দফা বন্যায় ১০টি সেতু ও কাঠের তৈরি পুলবিলীন হয়েছে নদী-ছড়াতে। চা বাগানের ছায়া বৃক্ষ, সামাজিক বনায়নের মূল্যবান বৃক্ষ, ব্যক্তি পর্যায়ে লাগানো ফলজ বৃক্ষ তলিয়ে গেছে নদী ও ছড়ায়। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সড়ক যোগাযোগ।

অভিযোগ উঠেছে সরকারি নিয়মনীতি না মেনে ইজারাদার নির্দিষ্ট স্থান থেকে বালু উত্তোলনের পর জনবহুল রাস্তায় ওপর রেখে বিক্রি করা হয়। উপজেলার গাজীপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে, দেওরগাছ বাজারে ও পৌর শহরের খোয়াই নদী থেকে বালু উত্তোলন করে রানীগাঁও সড়কের পাকুরিয়া নামক স্থানের বৈধ-অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করা হয়। অনেক জায়গায় সরকারি ডাককৃত ঘাটে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে।

বালুবাহী ট্রাক্টরের চলাচলে চুনারুঘাট উপজেলার এমন কোন সড়ক নেই যেখানে অক্ষত আছে। সবগুলো সড়কপথে বালুর গাড়ি চলাচল করার কারণে ভেঙে খান-খন্দে ভরে গেছে। নদী পাড়ের মানুষের আর্তচিৎকার কারো কানে প্রবেশ করছে না। জানা যায়, খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম বেঁধে দিয়ে লিজ হোল্ডারদের নির্দিষ্ট এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি প্রদান করে। কিন্তু খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের শর্তকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা শক্তিশালী মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করে দিনের পর দিন। শক্তিশালী মেশিনের টানে নির্ধারিত ক্ষেত্রের বাইরে থেকেও বালু চলে আসে মেশিনের পাইপে। এতে করে নদী-ছড়া গভীর হয়ে পড়ে। প্রশাসন ওই প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের পদক্ষেপই নিতে না পারায় সেই লিজ হোল্ডাররা পুরো উপজেলার নদী ছড়া থেকে বালু উত্তোলন করে চা-বাগান ও পাহাড় ঘেরা চুনারুঘাট উপজেলার মানচিত্রকেই পাল্টে দিয়েছে। চলতি বছর বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে রামগঙ্গা ও চন্ডিছড়া সেই নদী-ছড়াতে প্রচন্ড বেগে পানি প্রবাহিত হয়। পানির তোরে নদী-চড়ার তীর ভেঙে পড়ে নদীতে। সঙ্গে ভাসিয়ে নেয় গুরুত্বপূর্ণ সেতু, রাস্তা-ঘাট, বাড়ি-ঘর।

সূত্র জানায়, চুনারুঘাট উপজেলায় মাত্র ৫টি বালুর মহাল রয়েছে কিন্তু প্রতিটি ছড়া, নদী লিজ হোল্ডাররা রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে দখলে নিয়ে গেছে। এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে গেলেই হামলা, মানববন্ধন, বদলির হুমকি আসে। এ কারণে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছেন না। পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজন ব্যক্তি জানান, খোয়াই নদীর উবাহাটা, কাজিরখিল, পাকুরিয়া ও রাজারবাজার অংশে দিনে রাতে ২৪ ঘণ্টা একাধিক মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে দিনেই ট্রাক-ট্রাক্টরে করে তা পাচার করা হয়। নদীর নানা প্রান্ত থেকে বালু উঠছে মেশিন দিয়ে। সচেতন ব্যক্তিরা বললেন, এ মূহুর্তে চুনারুঘাটে বালু উত্তোলন প্রথাটি চিরতরে বন্ধ করে না দিলে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর চুনারুঘাট উপজেলাটিকে আর বাঁচানো যাবে না।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মঈন উদ্দিন ইকবাল বলেন, চুনারুঘাটের প্রাকৃতিক সম্পদ আজ হুমকির মুখে। রাজনৈতিক নেতাদের আন্তরিকতা ও দেশ প্রেমই পারে কেবল চুনারুঘাটকে বাঁচাতে।