• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৬ মে ২০১৮, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৯ রমজান ১৪৩৯

বজ্রপাতের ভয়ে ধান কাটতে রাজি হচ্ছেন না শ্রমিকরা

বাম্পার ফলনেও দিশেহারা কৃষক

সংবাদ :
  • বিমান বিহারী দাস, জেলা বার্তা পরিবেশক, টাঙ্গাইল

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৭ মে ২০১৮

image

টাঙ্গাইল : বৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে নুয়ে পড়েছে পাকা ধান -সংবাদ

টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলার হাইব্রিড, ঊফশী ও স্থানীয় জাতের বোরো আবাদের পাঁকা-আধাপাকা সোনালী ধান এখন বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে। জেলায় এবার ধানের বাম্পার ফলন হলেও প্রকৃতির বিরূপ প্রভাবে কৃষকরা মাঠের ফসল ঘরে তুলতে পারছে না। ফলে ধানের বাম্পার ফলন মৌসুমের বৈশাখী ঝড় ও টানাবৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি কৃষকের স্বপ্ন কেড়ে নিচ্ছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বজ্রপাতের পরিমান বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষক ও ধানকাটা শ্রমিকরা বজ্রপাতের ভয়ে ধান কাটছে না। বজ্রপাতে মৃত্যুর এই আতঙ্কের কারণে ধানকাটা শ্রমিকরাও মজুরি বৃদ্ধি করে দিয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে জমির মালিকরা। সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার দিগন্তজোড়া সোনালী-রূপালী ধানের সমারোহ। আর কয়েকদিন পরই কৃষকের ঘরে উঠার কথা, কিন্তু গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ আর বৈশাখী ঝড়ে পাঁকা ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। গ্রীস্মের এ সময় এমন ভারি বর্ষণে কৃষকদের ঘিরে চলছে হতাশা। এ বছর ধানের চারা রোপনের পর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গত বছরের তুলনায় ফলন অনেক ভালো হয়েছে। কিন্তু কালবৈশাখী ঝড় আর টানা বৃষ্টিতে লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কালবৈশাখী ঝড়, ভারী বর্ষণ, বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টিতে নিচু জমি ও চরাঞ্চলের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে যেসব কৃষক অধিক শ্রমিক মূল্য দিয়ে ধান কাটছে তারা বৃষ্টির কারণে মাড়াই ও শুকাতে পারছে না। কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানে এবার জেলায় মোট ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ৯৮ হেক্টর জমিতে ৬৫ লাখ ৬১ হাজার ৮৫ মেট্রিকটন বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কৃষি বিভাগের উপজেলা ওয়ারি পরিসংখ্যানে জানা গেছে, এবার টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় মোট ১৪ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে ৫৫ হাজার ৬৩ মে.টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বাসাইল উপজেলায় ১০ হাজার ৮৯৪ হেক্টরে ৪২ হাজার ৭৭৮ মে.টন, কালিহাতী উপজেলায় ১৭ হাজার ৫৫৯ হেক্টর জমিতে ৬৮ হাজার ৮৩৪ মে.টন, ঘাটাইলে ২০ হাজার ২৮৫ হেক্টরে মোট ৮০ হাজার ১০৬ মে.টন, নাগরপুরে ১৫ হাজার ৯৮৪ হেক্টরে ৬২ হাজার ৮৭৪ মে.টন, মির্জাপুরে ১৯হাজার ৮৫৩ হেক্টরে ৭৭ হাজার ৯০৬ মে.টন, মধুপুরে ১১ হাজার ৯৪৩ হেক্টরে ৪৭ হাজার ১১৭ মে.টন, ভূঞাপুরে ৬ হাজার ৬২৫ হেক্টরে ২৫ হাজার ২০২ মে.টন, গোপালপুরে ১৩ হাজার ৬৯৩ হেক্টরে ৫৪ হাজার ২২০ মে.টন, সখীপুরে ১৬ হাজার ৪৫১ হেক্টর জমিতে ৬৪ হাজার ৬৪১ মে.টন, দেলদুয়ারে ৯ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে ৩৬ হাজার ৫৮৪ মে.টন, ধনবাড়ীতে ১০ হাজার ২৯৬ হেক্টর জমিতে ৮০ হাজার ৮৬০ মে.টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

প্রচন্ড শীতের কারণে এবার প্রায় সব উপজেলায়ই বোরো বীজতলায় ‘কোল্ড ইনজুরি’ হয়। তার ওপর ধানের চারার গোড়ায় পঁচন ধরে কোন কোন এলাকায় রোপণ করা চারা মরে যাওয়ায় সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া কিছু এলাকায় ধানে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ করে। কৃষি বিভাগের সার্বক্ষণিক তৎপরতায় কৃষকরা সেসব সমস্যা মোকাবেলা করতে সক্ষম হন। নাগরপুর উপজেলার মামুদনগর গ্রামের কৃষক রমিজ উদ্দিন, কেদারপুরের কৃষক রফিক মিয়াসহ অনেকেই জানান, এবার ধানের বাম্পার ফলন হলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। ঝড়, বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে শ্রমিকরা জমিতে নামতে সাহস পাচ্ছে না। টানা বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি বাড়ছে। ফলে নিচু জমির ধান তলিয়ে যাচ্ছে। মির্জাপুর উপজেলার কৃষক লেহাজ উদ্দিন, জালেকা বেগম, সৈয়দ রুহুল আমিনসহ অনেকেই জানান, ওই এলাকায় প্রতি একর জমির ধান বুনতে হালচাষ, সার, শ্রমিক মজুরি ও ধানের চারা কিনতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা কৃৃষকরা ব্যয় করেছেন। অতিরিক্ত টাকা খরচ করেও তারা চাষ করেছিলেন। জমিতে ফসলও ভালো হয়েছে। কিন্তু ঝড় ও বর্ষণে জমির ধান নূয়ে পড়েছে। বজ্রপাতের আশঙ্কায় শ্রমিকরা ধান কাটতে জমিতে নামছে না। নাগরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিএম রাশেদুল আলম জানান, তিনি উপজেলার ভাদ্রা, সহবতপুর ও ভারড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিদর্শন করে কৃষকদের শান্তনা ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। যদি সামনে আর শিলা বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড় না হয় তাহলে কৃষকরা কাঙ্খিত ফলন পাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। মির্জাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, উপজেলায় ঠান্ডার প্রভাব বেশি থাকায় কিছু এলাকার ধানের চারা মরে যায়। কৃষি কর্মকর্তারা দ্রুত যথাযথ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করায় উপজেলায় বোরো’র বাম্পার ফলন হয়েছে। ধান ঘরে উঠানোর প্রাক্কালে প্রকৃতি প্রতিকূল থাকায় কৃষকরা কিছুটা হতাশায় ভুগছে। এ বিষয়ে টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক জানান, আবাদের শুরুতে কোন কোন এলাকায় কোল্ড ইনজুরি দেখা দিলেও তা বোরো আবাদে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। জেলায় এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো-২৮ জাতের ধান চাষ হয়। তবে বোরো-২৮ জাতের ধানে কোন কোন এলাকায় ব্লাস্ট রোগ দেখা দেয়। কৃষি কর্মকর্তারা দ্রুত সব সময় কৃষকদের পাশে থেকেছে। প্রকৃতিগত কারণে ধান ঘরে তুলতে কৃষকদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে- এটা সাময়িক। দ্রুত এ অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে তিনি আশা করেন।