• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২২ জিলহজ ১৪৪০

বিপন্ন নদীমাতৃক বাংলাদেশ

মানবসৃষ্ট নানা সংকটে ১৭ নদ-নদী ফসলের মাঠ

সংবাদ :
  • জেলা বার্তা পরিবেশক, নীলফামারী

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৯

image

নীলফামারী : শুকিয়ে যাওয়া নদীতে বোরো ফসল -সংবাদ

নীলফামারী পৌর এলাকার মার্কাস মসজিদপাড়া এলাকার নব্বই পেরুনো আলাউদ্দীন আলী ভাষায়, আজকের মৃতপ্রায় বামনডাঙ্গা নদীর এক সময় ছিল ভরা যৌবন। বয়ে যেতো দুকুল ছাপিয়ে। সুকনো মৌসুমেও নদীর বুকে ছিল উত্তাল ঢেউ। সে সময় ব্যবসা বাণিজ্যের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল নদী পথ। বামনডাঙ্গা নদীতে চলতে পাল তোলা নৌকা, ডিঙ্গি নৌকা ও বজরা। পাওয়া যেত দেশীয় প্রজাতির মাছ। এ নদীকে ঘিরে গড়ে উঠে ঐতিহাসিক শাখামাছা বন্দর। আজ আর সেই শাখা বন্দরের কোন অস্তিত্ব না থাকলেও মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি শাখামাছা নাম। এ নামে এখনও রয়েছে বিখ্যাত শাখামাছা হাট। শাখামাছা বন্দরকে ঘিরে ক্রমান্বয়ে গড়ে উঠে আজকের নীলফামারী।

কিন্তু সেই ভরা যৌবন বহমান বামনডাঙ্গা নদী দখলবাজদের দখলে। ক্ষীনকায় এ নদীতে বর্ষা মৌসুমে কিছুটা প্রবাহ থাকলেও সুকনো মৌসুমে দেখে বোঝার উপায় নেই এটি এম সময়ের উত্তাল বামনডাঙ্গা নদী। নদীর বুকে ময়লা আবর্জনার স্তুপ। কোথাও কোথাও হচ্ছে চাষাবাদ। নদীটি খনন করা হলে কিছুটা হলেও ফিরে পাবে অতীত ঐতিহ্য। বর্ষা মৌসুমে নীলফামারী শহর থাকবে জলাবদ্ধমুক্ত। রক্ষা হবে জনস্বাস্থ্য।

নীলফামারী সদর উপজেলার কচুকাঁটা ইউনিয়নের দুহুলী এলাকার সত্তুরোর্ধ জবান উদ্দীন বলেন, মাত্র ছয় কিলোমিটারের ব্যবধানে বুড়িখোড়া এবং চাড়ালকাঁটা নদীর অবস্থান। এক সময় দুই নদীর প্রস্থ ছিল কোয়াটার কিলোমিটারের মতো। এখন তা এসে দাঁড়িয়েছে ৫০ থেকে ৬০ ফুটের মধ্যে। দিনের পর দিন পলি জমে এ দু’টি নদী অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে। সমতল ভূমি থেকে নদীর গভীরতা গড়ে দুই থেকে তিন ফুট। সুকনো মৌসুমে নেই কোন প্রবাহ। নদীর বুকে এলাকার কৃষকেরা আবাদ করছেন ধান, গম, ভুট্টা, আলুসহ নানাবিধ সবজি। নদীর বুকে বাতাসে দোল খাচ্ছে সবুজ সতেজ বোরো ক্ষেত। এসব নদী খনন করা হলে ফিরে আসবে নাব্যতা। কিছুটা হলেও নদী ফিরে আগের সেই যৌবন। পাওয়া যাবে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ। রক্ষা হবে পরিবেশের ভারসাম্য।

নীলফামারীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদ-নদীগুলো এখন আবদি জমি। স্থানীয় কৃষকেরা নদীর বুকে আবাদ করেছে ইরি-বোরো ধান, গমসহ বিভিন্ন ফসল। নদীর বুকে সবুজের সমারোহ। বাতাসে দোল খাচ্ছে সবুজ-সতেজ বোরো ক্ষেত। এক সময়ের খরস্র্রোতা এসব নদ-নদীর গভীরতা সমতল ভূমি থেকে কোথাও দুই ফুট কোথাও বা তিন ফুট। দিনের পর দিন পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে সউল, বোয়াল, শিং, মাগুড়, কৈসহ দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ। বর্ষা মৌসুমে অল্প বৃষ্টিতে এসব নদীর দুকুল ছাপিয়ে প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসলাদি। বসত বাড়িতে থৈ থৈ করে হাটু পরিমাণ পানি। দুই তিন এসব বাড়িতে পানি জমে থাকায় লোকজন পানিবাহিত ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এতে করে পরিবেশের যেমন ক্ষতি হচ্ছে তেমিন আগামী প্রজন্মের কাছে নদী শব্দটি থেকে যাবে ইতিহাসের পাতায়। অর্ধ শতাব্দী আগেও জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়ি তিস্তা, চাড়ালকাঁটা, বুড়িখোড়া, ধুম, কুমলাই, নাউতারা, যমুনেশ্বরী, নলডাঙ্গা, ইছামতী, খরখরিয়া, বুল্লাই, দেওনাই, শালকী, বামনডাঙ্গা, চিকলীসহ ১৭টি নদ-নদী ছিল বহমান। প্রবাহিত হতো দু’কুল ছাপিয়ে। ছিল বাঙালির চিরচেনা নদীর রুপ। সে সময় চলাচল করত পাল তোলা নৌকা, ডিংগি নৌকা আর বজরা। কিন্তু কালের বিবর্তন আর সংস্কারের অভাবে পলি জমে নদীগুলো এখন পরিণত হয়েছে আবাদি জমিতে। দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলা এক সময়ের খরস্র্রোতা নদ-নদী।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কৃষিবিদ আশরাফুজ্জামান বলেন, পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর বুকে আবাদ হচ্ছে ধানসহ বিভিন্ন ফসল। প্রবাহ না থাকায় হারিয়ে গেছে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ। আমিষের ঘাটতি পুরনে খেতে হচ্ছে হিমসিম। সরকার মাছের চাহিদা মেটাতে পুকুর ও জলাশয় খননের কাজ করছে। পাশাপাশি এবারে সরকার নদী খননের কাজ হাতে নিয়েছে। নীলফামারী জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদ-নদীগুলো খনন করা হলে ফিরে পাবে নাব্যতা। প্রকৃতিগতভাবে পাওয়া যাবে দেশীয় প্রজাতির মাছ। যা ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। এসব নদীতে মাছ শিকার করে আয়েশে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে মৎস্যজীবী পরিবারগুলো। এতে তাদের সংসারে ফিরে আসবে স্বচ্ছলতা। পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারী ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, নীলফামারী জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৭টি নদ-নদী পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এলাকার কৃষকেরা চাষাবাদ করছে বিভিন্ন ফসল। যা পরিবেশের জন্য নেতিবাচক প্রভাব। সরকারের নদী খনন কর্মসূচির আওতায় নীলফামারীর বিভিন্ন নদ-নদীর ৩২০ কিলোমিটার খনন করা হলে ফিরিয়ে আসবে নাব্য। পাওয়া যাবে দেশীয় প্রজাতির মাছ। ফিরিয়ে আসবে পরিবেশের ভারসাম্য।