• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ১৭ জিলহজ ১৪৪১, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

শিক্ষাব্রতী ডা. আমজাদের মহতী অবদান

ভার্সিটি মেডিকেলসহ ১৬ শিক্ষালয়ে অনন্য তাঁতসমৃদ্ধ গ্রাম এনায়েতপুর

সংবাদ :
  • আশরাফুল ইসলাম সওদাগর, চৌহালী (সিরাজগঞ্জ)

| ঢাকা , সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২০

image

সিরাজগঞ্জের যমুনার পাড়ে অবস্থিত চৌহালী উপজেলার এনায়েতপুর শিক্ষা বিস্তারে পৃথিবীর এক অনন্য গ্রাম। তাঁত শিল্পসমৃদ্ধ গ্রামটিতে প্রাথমিক থেকে শুরু করে মানসম্মত সর্বোচ্চ শিক্ষার বিদ্যাপিঠ থাকায় প্রতিদিন দেশ বিদেশের ৮ হাজার ৪শ’ জন ছাত্র-ছাত্রীর পদভারে আলোকিত হচ্ছে জনপদ। এক্ষেত্রে নিজের বসবাসের জায়গাটুকুও দান করে প্রয়াত ডা. এমএম আমজাদ হোসেনের প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, নার্সিং কলেজ, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও কলেজ, মেহের-উন- নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এখানে দেশ-বিদেশের শিক্ষার্থীরা যেমন শিক্ষা পাচ্ছে, তেমনি দরিদ্র মেধাবীরাও বিনা পয়সায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। মানবহিতৈষী কর্মবীর আমজাদ হোসেন মনে করতেন, পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের চারিত্রিক মানবিক উৎকর্ষ বৃদ্ধি করাই শিক্ষার লক্ষ্য। এছাড়া গ্রামটিতে উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন স্কুল মিলিয়ে রয়েছে আরও ১১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

জানা যায়, ১৯৫২ সালে সিরাজগঞ্জের মুসলিম প্রধান এনায়েতপুর অঞ্চলে নারী শিক্ষাকেন্দ্র ছিল না। ওই সময় এলাকার মেয়েরা ঘর-সংসার করার মানসিকতায় বেড়ে উঠত। নারী শিক্ষা বলতে ছিল মক্তব। তখন শিক্ষানুরাগী ডা. আমজাদ হোসেন পাকিস্তান আর্মির মেডিকেল কোরে সবে যোগদান করেছেন। বিষয়টি ভেবে মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় গড়ার উদ্যোগ নিলে বাবা আলহাজ মোসলেম উদ্দিনসহ মুরুব্বিরা বাধা দেন। তাদের নারী শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। পরে ৮ বিঘা জায়গা বাবা মোসলেম উদ্দিন স্কুলের জন্য দান করেন। তিনি মায়ের নামে ফেব্রুয়ারিতে এনায়েতপুরে মেহের-উন-নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রয়াত ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজ চৌধুরীকে প্রধান শিক্ষক করে ১১ জন ছাত্রী নিয়ে স্কুলটি পথ চলা শুরু করে। ৬৮ বছরের পথচলায় ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর স্কুলটিতে ৮৩০ জন ছাত্রী লেখা পড়া করছে। এরপর মানুষের দ্বোর গোড়ায় বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা ও শিক্ষার বিস্তারে উপমহাদেশের প্রখ্যাত ওলিয়ে কামেল হযরত খাজা ইউনুছ আলী (রঃ) নামে ২০০৩ সালে এনায়েতপুরে গড়ে তোলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনার তীরে প্রায় দেড়শ একর জায়গায় অনন্য স্থাপত্য শৈলী ও মনোরম পরিবেশে স্থাপন করেন ৫৮৬ বেডের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, খাজা ইউনুস আলী নার্সিং কলেজ, খাজা ইউনুস আলী ল্যাবরেটারি স্কুল ও কলেজ। খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজে ৫শ’ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে অর্ধেক ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। এরপর ২০১২ সালে একই চত্বরে চালু করেন খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৪টি বিষয়ের ওপর এখানে দেশের ১৪শ’ ৫০ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে।

ডা. আমজাদ হোসেন সব গ্লানি, হীনমন্যতা দূর করে চলতেন বলে নিজের জন্য রাখেননি কিছুই। শিক্ষা বিস্তারে নিজের বসতবাড়িটাও দান করেছেন খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজকে। খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. হোসেন রেজা। তিনি জানান, জীবনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ-বিদেশের নোবেল বিজয়ী থেকে শুরু করে বিখ্যাত সব মানুষের সানিন্ধ্য হয়েছে। শিক্ষা-চিকিৎসা সেবা প্রদান, মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ মানবিকতায় অবদান রাখা আমজাদ হোসেনের মতো এমন হৃদয়বান কাউকে পাইনি। তিনি স্র্রোতের বিপরীতে অনগ্রসর মানুষকে উচ্চতর শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে গ্রামে বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে নজির স্থাপন করেছেন। তার বিচক্ষণতায় শিক্ষা বিস্তারে পৃথিবীর অনন্য গ্রাম এনায়েতপুর।

এনায়েতপুর ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ১৯৪৭ সালে চালু হয়। মেধার বিকাশে জেলায় সেরা স্কুলটিতে বর্তমানে ২ হাজার ৪৪৭ জন ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করছে।

এনায়েতপুর ফাজিল সিনিয়র মাদ্রাসা, এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মোহনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাঝগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এনায়েতপুর কিশলয় কিন্ডার গার্টেন স্কুল, খাজা এনায়েতপুরী ক্যাডেট একাডেমি, কাবাতুন নেছা কিন্ডার গার্টেন, রংধনু ডিজিটাল স্কুল, আল মদিনা কিন্ডার গার্টেন, এনায়েতপুর প্রতিবন্ধী স্কুল। এদিকে উল্লেখিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ এই গ্রামে রয়েছে।

চৌহালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার দেওয়ান মওদুদ আহমেদ জানান, যমুনার তীরে অবস্থিত এনায়েতপুরের মতো একটি গ্রামে ১৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিন্তা করলে অবাক হতে হয়। শিক্ষা বিস্তারের কারণেই এই অঞ্চলটি দেশ জুড়ে প্রশংসিত। এ ব্যাপারে সাবেক মন্ত্রী সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ বিশ্বাস ও বাংলাদেশ এ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সহ-সভাপতি জ্যোর্তিবিজ্ঞানী এফ.আর সরকার জানান, এনায়েতপুর গ্রাম শিক্ষা বিস্তারে পৃথিবীতে এক ইতিহাস। বিভিন্ন দেশে গিয়েছি, এতগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রাম কোথাও দেখিনি। এক্ষেত্রে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন ডা. এমএম আমজাদ হোসেন। পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও মানবিক কর্মকাণ্ড তাকে আজীবন বাঁচিয়ে রাখবে।