• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ৩০ চৈত্র ১৪২৭ ২৯ শাবান ১৪৪২

বাংলাদেশের পোশাক খাত

নতুন অর্ডার আসতে শুরু করলেও থামছে না শ্রমিক ছাঁটাই

| ঢাকা , রোববার, ২৮ জুন ২০২০

image

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে পশ্চিমা ব্রান্ডগুলো অনেক অর্ডার বাতিল করেছে। সেই বাতিল অর্ডারগুলোও ধিরে ধীরে আবার আসতে শুরু করেছে। তবে কিছু অর্ডার বাতিল হলেও সুরক্ষামূলক মাস্ক, গ্লাভস ও গাউন তৈরির নতুন অর্ডার পেয়ে অধিকাংশ কারখানায় প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে। তারপরও অনেক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রেখেছে। আবার কোন কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। কোন কারখানা বেতন না দিয়ে একেবারেই বন্ধ করে দিচ্ছে। এতে করোনায় মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেও চাকরি হারানোর আতঙ্কে রয়েছে শ্রমিকরা। এএফপি।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জারা, কেলভিন ক্লেইন ও টমি হিলফিগারের মতো ব্রান্ডের মালিকদের পোশাকের বড় সরবরাহকারী ব্রেক্সিমকো। এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ নাভিদ হোসেন বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতে আমরা সুযোগ দেখতে পেয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে আমরা পিপিই তৈরি শুরু করেছি। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হ্যানস ব্রান্ডের কাছে ৬৫ লাখ মেডিকেল গাউন রপ্তানি করেছে বেক্সিমকো। এ বছরে তারা প্রায় ২৫ কোটি ডলারের সুরক্ষা সামগ্রী রপ্তানি করার আশা করছি। আমাদের ৪০ হাজার শ্রমিকের মধ্যে এখন শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ পিপিই তৈরিতে নিয়োজিত। করোনাভাইরাস বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছে।

পশ্চিমা খুচরা ক্রেতাদের জন্য তৈরি পোশাকের চাকরি হারিয়েছিলেন সুমাইয়া আকতার ও রুবেল মিয়া। চূড়ান্ত দফায় তারা কাজ ফিরে পেয়েছেন। ৩৪ বছর বয়সী সুমাইয়া আকতার বলেছেন, অনেকে যখন চাকরি হারিয়েছেন তখন আমি কাজ ফিরে পাওয়ায় নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। তবে বর্তমানে অনেক জটিলতার মোকাবিলা করছি। তা সত্ত্বেও ন্যূনপক্ষে আমি পরিবার ও পিতামাতাকে তো খাবার যোগান দিতে পারছি।

গত দুই দশকে চীনের পরেই তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে এসেছে বাংলাদেশ। তারা পোশাক প্রস্তুত করে প্রাইমার্ক এবং এইচএন্ডএমের মতো ব্রান্ডের জন্য। করোনাভাইরাস মহামারীর আগে, বাংলাদেশ বছরে রপ্তানি থেকে যে ৪০০০ কোটি ডলার আয় করত তারমধ্যে শতকরা ৮০ ভাগের মতো আসতো এই খাত থেকে। এখানে কর্মসংস্থান হয়েছিল ৪০ লাখেরও বেশি মানুষের। এরমধ্যে বেশির ভাগই গ্রামের দরিদ্র নারী।

কিন্তু বিশ্বজুড়ে যখন লকডাউনের কারণে সবকিছুর পতন শুরু হয়। তখন বাংলাদেশের প্রায় ৪৫০০ পোশাক প্রস্তুতকারকদের শিপমেন্ট এপ্রিলে আটকে যায় শতকরা ৮৪ শতাংশ। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্যে দেখা যায়, আগেই প্রায় ৩২ লাখ ডলারের অর্ডার বাতিল করা হয়েছিল অথবা স্থগিত করা হয়। এমন অবস্থায় চুক্তিতে লোকসান ও দেশের ভিতরে লকডাউনের কারণে বেশির ভাগ কারখানাই শত শত শ্রমিককে বরখাস্ত করে। ফলে দেখা দেয় বিক্ষোভ, প্রতিবাদ। এক্ষেত্রে অর্ডারের ফলে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু বিজিএমইএর মুখপাত্র খান মনিরুল আলম শুভ বলেছেন, গত বছরে গার্মেন্ট খাত যে পরিমাণ উপার্জন করেছিল, নতুন অর্ডারের পরিমাণ তার তুলনায় অনেক কম। জুনে আমাদের কারখানার সক্ষমতার শতকরা মাত্র ৫৫ ভাগ সচল।

বর্তমানে করোনাভাইরাস সংক্রমণে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ। কারখানায় কাজ শুরুর অর্থ হলো, সামাজিক দূরত্ব ও মুখে মাস্ক পরার মতো অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে। কারখানা একজন মালিক স্বীকার করেন, কাজের প্রকৃতির কারণে কারখানার ভিতরে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা একেবারেই অসম্ভব। বিজিএমইএ জানিয়েছে, মেডিকেল সামগ্রী পরিধানের মতো বিষয়ে গুরুত্ব দেয়ায় আবার অনেক কারখানা আশাবাদী হয়ে উঠেছে। মনিরুল আলম শুভ বলেন, করোনা মহামারী শুরুর পর থেকে এবং এতে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে পিপিই তৈরি শুরু করেছে কমপক্ষে ৩০টি কারখানা। অন্য যেসব কোম্পানি আগেই সুরক্ষামূলক পোশাক সীমিত আকারে তৈরি করেছিল তারাও উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে পশ্চিমা ক্লায়েন্টদের চাহিদার প্রেক্ষিতে।

ফকির এপারেলসের পরিচালক মশিউর রহমান শম্মু বলেছেন, মাত্র তিন দিন আগে আমরা একটি রপ্তানির অর্ডার পেয়েছি। এটা দুই কোটি সার্জিক্যাল গাউনের অর্ডার। এখন আমাদের সব কারখানা পুরো বছরের জন্য বুকড। তিনি তাদের ৫টি কারখানাকে এরই মধ্যে পিপিই তৈরির কারখানায় রূপান্তরিত করেছেন। নিয়োগ দিয়েছেন আরও ৪০০ শ্রমিক। এ বছর তিনি ২০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন। নাভিদ হোসেন বলেন, আমাদের রয়েছে বিশ্বমানের কারখানা। পিপিই প্রস্তুতের নতুন প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার মতো ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল আইএমএফের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান এইচ মানসুর বর্তমানে ঢাকাভিত্তিক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কাজ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে গার্মেন্টস খাত তার সক্ষমতার শতকরা ৫০ ভাগ সচল। এক্ষেত্রে পিপিই উৎপাদনের ধারা কিছু স্বস্তি নিয়ে আসবে। কিন্তু এই বিশাল নিষ্ক্রিয় সক্ষমতা ন্যূনতম ব্যয় এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রূপান্তরিত করা যায়। এই ধরনের চাহিদা শক্তিশালী হতে চলেছে।

তবে দেশের গার্মেন্টসগুলো সচল হতে শুরু করলেও অনেক কারখানায় কর্মী ছাঁটাই চলছে। করোনা সংকটের মধ্যে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় প্রায় অর্ধলক্ষ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। রপ্তানি অর্ডার কমার অজুহাতে জনবল ছাঁটাই করার আতঙ্কে রয়েছেন পোশাক কর্মীরা। এ নিয়ে কোন না কোন কারখানা বা শিল্পাঞ্চলে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। দেশজুড়ে গার্মেন্ট কর্মী ছাঁটাইয়ের এমন ইঙ্গিত অবশ্য জুনের শুরুতেই দিয়েছিলেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিক ও রপ্তানিকারকদের সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি ড. রুবানা হক। বিজিএমইএ সভাপতির বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মুখে এখন বিজিএমইএ নেতারা আশ্বাস বাণী শুনিয়ে বলেছেন, শীঘ্রই সংকট কাটিয়ে আগের রূপে ফিরবে পোশাক খাত। তাই কিছুদিন বেকার থাকলেও সব শ্রমিকই তিন মাসের মধ্যে কাজে ফিরবেন এমন আশ্বাস কারখানা মালিকদের।

এদিকে, শ্রমিকদের আগামী তিন মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ স্বল্প সুদে লোন হিসেবে বরাদ্দ দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আবেদন করেছেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। পোশাক খাতে উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ’র নেতারা অর্থমন্ত্রীর বরাবরে এ আবেদন করেছেন। তবে এ প্রসঙ্গে সরকার সমর্থক বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক-কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, শ্রমিকরা এমনিতে করোনা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এরপর তাদের ওভারটাইম করার সুযোগ কমে গেছে।

চাকরি হারানোর আতঙ্ক চলছে। এরমধ্যে ছাঁটাই হচ্ছে শ্রমিক। এ শ্রমিক নেতা আরও দাবি করেন, এর আগে পোশাক শিল্প খাতের জন্য সরকারের প্রণোদনার অর্থ অনেক কারখানা গ্রহণ করেও শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করেনি। উল্টো শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন করে প্রণোদনা বরাদ্দ দেয়ার আগে এটা নিশ্চিত করতে হব যেন সেটা সরাসরি শ্রমিকের হাতে যায়। তবে এ মুহূর্ত শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাদের জীবন ধারণের মতো খাদ্য সহায়তা দিতে হবে, কার্ডের মাধ্যমে বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ করতে হবে।