• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২২ মে ২০১৯, ৮ জৈষ্ঠ্য ১৪২৫, ১৬ রমজান ১৪৪০

সাহিত্যের স্বতন্ত্র স্বর নির্মাণ-বিনির্মাণ

মাহফুজ আল-হোসেন

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯

image

সারসংক্ষেপ

সাহিত্য হচ্ছে মানুষের নান্দনিক ভাষিক অভিব্যক্তি এবং এর মাধ্যমে সাহিত্যস্রষ্টা তাঁর কালের এবং ভাবীকালের পাঠকের সাথে শৈল্পিক যোগসূত্র স্থাপন করার সুযোগ পান। সাহিত্যকর্ম- সেটি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক কিংবা প্রবন্ধ, ফিকশন বা নন-ফিকশন যে প্রকরণেরই হোক না কেন, তার প্রকাশভঙ্গির একটি স্বর থাকে। চিন্তন ও সমাজবাস্তবতায় ভাষা ও শৈলীতে পরিবর্তন-বিবর্তন এবং সাহিত্যস্রষ্টা কর্তৃক নানামুখী নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে সাহিত্যের এই স্বর পুনর্নিমিত বা বিনির্মিত হয়।

এক

সাহিত্য ভাষিক শিল্প, ভাষা এর বাহন। ভাবপ্রকাশের আদিমতম পর্যায়ে মানব হৃদয়ে ভাষাবোধের উৎপত্তি। কালক্রমে তা থেকে সাহিত্যের সৃষ্টি। সাহিত্যের স্বাদ আকর্ষণীয় হলেও সাহিত্যতত্ত্ব সাধারণ ব্যক্তি তো বটেই সাহিত্য স্রষ্টার কাছেও জটিল বিষয়। অথচ সাহিত্যের প্রকৃত রস আস্বাদন করতে হলে তত্ত্ব তালাশ করা একান্ত জরুরি। কোন গোপন রহস্যবলে সাহিত্যিকের রচনা রমণীয় হয়ে ওঠে সেসব বিষয়ে সাহিত্যতাত্ত্বিকরা আড়াই হাজার বছর ধরে তত্ত্বের সন্ধান দিয়ে চলেছেন। ভারতীয় আলঙ্করিকদের সাহিত্য জিজ্ঞাসার শুরুও প্রায় দুই হাজার বছরের প্রাচীন। ব্যাধের ছোঁড়া তীরে শরাহত ক্রৌঞ্চ বিয়োগের শোকে আদিকবি বাল্মীকির সৃষ্টি সংস্কৃত ভাষার প্রথম শ্লোককাব্য। হোমার তার মহাকাব্য ‘ইলিয়ড’-এর দ্বিতীয় সর্গে কাব্যসৃষ্টির প্রেরণা ‘মিউজ’-এর কৃপা থেকে পেয়েছেন বলে উল্লেখ করলেও সাহিত্য-সৃষ্টির জন্য যে রচয়িতার যুক্তিনির্ভর বিচারবুদ্ধি অনাবশ্যক এবং বর্জনীয় অ্যারিস্টোটল তা কখনোই স্বীকার করেননি। কাব্যসৃষ্টির অনুপ্রেরণা দৈবশক্তি কিংবা কাব্য ঈশ্বরের মনের বিকৃত অনুকরণ বলে সত্যভ্রষ্ট কবির স্থান আদর্শ রাষ্ট্রে হতে পারে না বলে প্লেটো মতামত দেন। কিন্তু তাঁর অনুগামী দার্শনিক অ্যারিস্টোটলের মতে কাব্যে উপর্যুক্ত অনুকরণের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কাব্যস্রষ্টা শিল্পীর সৃজনকৌশলে অনুকৃত রূপের রূপান্তর ঘটিয়ে নান্দনিকতার নির্মাণ করেন, যা পাঠকের অন্তরে প্রভূত আনন্দের সঞ্চার করে। অ্যারিস্টোটল প্রণীত অনুকরণতত্ত্ব প্রকৃতপক্ষে প্রথম পুর্ণাঙ্গ শিল্পতত্ত্ব, যার সাহায্যে সাহিত্য-শিল্পের যথাযথরূপ বিচার করা হয়। তিনি উপলব্ধি করেন, যথাযথ প্রতিরূপ অনুকরণের কাজ নয়। যা ঘটেছে, যা ঘটে থাকে, যা ঘটা সম্ভব এবং যা ঘটা উচিত- এসব কিছুর সমম্বয়ে মানুষ তার অনুকরণ ক্রিয়াকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে এবং সেটাই হলো সৃজনশীল শিল্প। সৃজনশীল শিল্প এবং প্রয়োজনমুখি শিল্প- এ দুইয়ের প্রভেদ তিনিই সর্বপ্রথম জনসমক্ষে তুলে আনেন। অ্যারিস্টোটল যখন শিল্প ও কাব্যতত্ত্ব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিলেন তখন গ্রিস-এ নাট্যচর্চা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রচলন ছিল নাট্য-প্রতিযোগিতার। ট্র্যাজেডি ও কমেডি দুইয়েরই অভূতপূর্ব প্রসার ঘটেছিল খৃস্টপূর্ব পঞ্চম-চতুর্থ শতকের গ্রিসে। ইতিহাসখ্যাত ট্র্যাজেডি রচয়িতা ইস্কাইলাস, সফোক্লিস এবং ইউরিপিডিস সে সময়েই অবির্ভূত হয়েছিলেন। গ্রিক ট্র্যাজেডির বিষয়বস্তু হলো কোন মহৎ বা শক্তিধর বীর চরিত্রের শোচনীয় পরিণাম। এ পরিণামের কারণ চরিত্রটির নিজস্ব অজ্ঞতাপ্রসূত কোনো ভ্রান্তি। কিন্তু কখনও কখনও সজ্ঞানে দেবতার রুদ্র-রোষের মুখোমুখি হবার ফলেও বীর চরিত্রের শোকাবহ পরিণাম ঘটেছে। তাতে চরিত্রের মহত্ত্ব কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হয়নি। অ্যারিস্টোটল তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ কাব্যতত্ত্ব (Poetics)-এর ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে ট্র্যাজেডির যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা এ-একবিংশ শতাব্দিতে এসেও প্রায় প্রাসঙ্গিক; অন্ততপক্ষে মৌলগত ও রূপগত লক্ষণের বাহক হিসেবে: ‘ট্র্যাজেডি হচ্ছে একটি গুরুগম্ভীর সম্পূর্ণ বিশেষায়তনিক সুনির্দিষ্ট ক্রিয়ার অনুকরণ, ভাষিক সৌকর্যে তার প্রতিটি অঙ্গ স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী, ক্রিয়াটির প্রকাশশৈলি বর্ণনাত্মক নয় বরং নাটকীয়; অধিকন্তু, এই ক্রিয়া ভীতি ও করুণার উদ্রেক করে এবং এর মধ্য দিয়ে সাযুজ্যমূলক অনুভূতিগুলোর পরিশীলন ঘটে।’

অ্যারিস্টোটল ট্র্যাজেডির নায়ক হিসেবে পুরুষ চরিত্রকে প্রাধান্য দিলেও তিনি বলেছিলেন, উন্নত মনের ব্যক্তিই ট্র্যাজেডির নায়ক হতে পারে। একটি স্ত্রী চরিত্র কিংবা ক্রীতদাস চরিত্রও উন্নত হতে পারে। তার এই উক্তি সমকালীন গ্রিক সমাজের চিন্তন-দ্বান্দ্বিকতার প্রতিফলন। তবে অ্যারিস্টোটল যে সমকালীন সামাজিক রক্ষণশীলতার কিছুটা উর্দ্ধে উঠে আসতে পেরেছিলেন- এখানেই তাঁর মহত্ত্ব। একই ধারণা আমরা পাই প্রাচীন ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রে, যেখানে মহত্ত্বসম্পন্ন উচ্চবংশীয় পুরুষকে নাটকের নায়কের মর্যাদা দেয়া হয়েছে লিখিতভাবে। কিন্তু সেখানেও মহৎ নারী চরিত্রের ব্যক্তিত্বকে অস্বীকার করা যায়নি বলেই লেখা হয়েছে স্বপ্নবাসবদত্তা (ভাস) এবং অভিজ্ঞান শকুন্তলাম (কালিদাস)-এর মতো নাটক।

দুই

অ্যারিস্টোটল পরবর্তী সাহিত্যচিন্তক ও কবি হোরেস-এর মতে শিল্পসৃষ্টিকে হতে হবে সহজ-সরল সঙ্গতিপূর্ণ। অপরদিকে লন্জাইনাস শব্দ নির্বাচন, যথাযথ বাক্প্রতিমার মাধ্যমে প্রকাশরীতির কৌলিণ্যের ওপর জোর দিয়েছেন- এজন্য এ দু’জনকে যথাক্রমে ক্লাসিসিজম ও নিও-ক্লাসিসিজমের জনক বলা হয়ে থাকে। ফরাসি কবি ও সমালোচক Nicolas Boilean (1636-1711) তাঁর ‘L art poetique’-অভিসন্দর্ভে চিন্তার স্বচ্ছতা ও যুক্তির সর্বময় গুরুত্বকে কবিতায় সবার ওপরে স্থান দেয়ার ওপর জোর দিয়েছিলেন। কেবলমাত্র ছন্দে ধৃত পদ রচনা কবিতা নয় বলেছিলেন ফিলিপ সিডনি (১৫৫৪-১৫৮৬)। হোরেস নির্দেশিত ‘delightful teaching-কেই সিডনি কবিতার সঠিক উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেছিলেন। ইংল্যান্ডে রেনেসাঁর কবি নাট্যকারদের মধ্যে বেন জনসন (১৫৭২-১৬৩৭)-এর মতো আর কেউ প্রাচীন রোমের কাব্য-নাটক এর সাহিত্যাদর্শকে তাঁর সমসাময়িক সমাজচিত্রণ ও শিল্প আঙ্গিকে এত সার্থক এবং সমান্তরালভাবে প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। ভাল মানুষ না হলে যে ভালো কবি হওয়া যায় না এমন কথাই বলেছিলেন জনসন।

এ কালপর্বে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী চরিত্র সর্বযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জীবনশিল্পী শেঙ্পীয়ার- যিনি মানবজীবনের রহস্য উদ্ঘাটন, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং আত্মআবিস্কারের প্রক্রিয়ায় জীবনের স্বরূপ ও ব্যাপ্তিকে উদঘাটন করে তাকে মহত্ত্বর জীবনে উত্তরণের ব্যঞ্জনায় তাঁর সাহিত্যকৃতিকে বিরল শিল্পকর্মে রূপান্তরিত করেছেন। ইংল্যান্ডের নাট্যমঞ্চে তৎকালে ছিল গ্রীন, কিড ও মার্লোর দোর্দ- প্রতাপ। তাঁদের গতানুগতিক ট্রাজেডির পরিবর্তে শেঙ্পীয়ারের সম্মোহক রচনাবলি ইংল্যান্ডের সাহিত্য, শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বপরিসরে তুলেই ধরেনি, একইসাথে তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ম্যাকবেথ, হ্যামলেট, ওথেলো, কিং লিয়ার ইত্যাদি তাঁকে সর্বকালিক দার্শনিক দ্রষ্টা ও শিল্পশ্রষ্টা হিসেবে মহাকালের বুকে অমর অক্ষয় স্থান নির্দিষ্ট করেছে।

তিন

‘Restoration’ তথা রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার যুগে কবি নাট্যকার সমালোচক জন ড্রাইডেন (১৬৩১-১৭০০) ছিলেন ইংরেজি সাহিত্য ও সাহিত্যতত্ত্বের প্রাঙ্গণে নিও-ক্ল্যাসিসিজমের প্রধান কান্ডারি। তাঁর চার বন্ধু Eugenius, Crites, Lisideius এবং Neander-এর সাথে কল্প-সংলাপের ছদ্মাবরণে রচিত ১৬৬৮-তে প্রকাশিত তাঁর সুদীর্ঘ প্রবন্ধ ‘Essay of pragmatic Poesy’ ছিল কবিতার সাহিত্যতত্ত্ব বিষয়ক সুসংবদ্ধ ডিসকোর্স। ফ্রান্সে নির্বাসিত দ্বিতীয় চার্লস-এর রাজ-সিংহাসনে অধিষ্ঠানের কারণে সেসময় ইংল্যান্ডের দরবারি সাহিত্যচক্রে ফরাসি ক্ল্যাসিসিজমের বিশেষ প্রভাব ছিল, বিশেষ করে Corneille ও Racine-এর রচনায়ও পড়েছিল এর ব্যাপক প্রভাব।

রেস্টোরেশন-পরবর্তী অষ্টাদশ শতক তথা ‘অগাস্টানযুগ’-এর প্রধান সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব আলেকজান্ডার পোপ (১৬৮৮-১৭৪৪) ও স্যামুয়েল জনসন (১৭০৯-১৭৮৪)। চিন্তায় নিজস্বতা কিংবা চমৎকারিত্বের পরিবর্তে সুপ্রাচীন ক্ল্যাসিক ঐতিহ্যের নিয়ম-নিগড়-শৃঙ্খলা পুনর্জ্ঞাপনই ছিল পোপের নান্দনিক ভাবনার সারকথা। যুক্তি ও গদ্যের যুগ অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে স্যামুয়েল জনসন ধ্রুপদিয়ানার নিরঙ্কুশ অনুসরণ ব্যতিরেকে বাস্তব জীবনের অনুকরণকেই শিরোধার্য করেন। রোমান্টিসিজমের দুই সার্থক প্রতিনিধি ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও কোলরিজ-এর যুগ্ম-কবিতার সংকলন ‘লিরিক্যাল ব্যালাডস্’- প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মধ্যবর্তীকালে ধ্রুপদিয়ানার বিপরীতে প্রকৃতি-মানুষ/সমাজের প্রেক্ষিতে মন্ময়তা- স্বতঃস্ফূর্ততা/রহস্যময়তা সাহিত্যের উপজীব্য করার শৈল্পিক দাবি সামনে নিয়ে আসেন এডওয়ার্ড ইয়ং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Conjectures On Original Composition’-এ। Sublime-এর ধারণাকে সৌন্দর্যের বিপ্রতীপ সম্পর্কে যুক্ত করে মণীষী এন্ডমন্ড বার্ক নান্দনিক অভিজ্ঞতার সুন্দর ও ভীতিপ্রদ এই দুই প্রকারভেদকে চিহ্নিত করেন তাঁর ‘A Philosophical Enquiry into the Origin of Our Ideas of the Sublime and Beautiful’ বইয়ে।

‘রোমান্টিসিজম’ ব্যক্তি-মানসের সহজাত প্রবণতা। ১৭৭০-১৮৪০ কালপর্বে সাহিত্যিক আন্দোলন হিসেবে এর আবির্ভাব ও কুলপ্লাবি বিস্তার ব্রিটেন এবং সমগ্র ইউরোপে। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ফরাসী বিপ্লবের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের প্রেরণা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সৃজন কল্পনার সারাৎসার শৈল্পিকভাবে এ আন্দোলনকে মহত্তম উচ্চতা দিয়েছে। জার্মান শিল্পতত্ত্ববিদ শ্লেগেল (১৭৭২-১৮২৯) রোমান্টিসিজমকে বর্ণনা করেন এমন এক কাব্য প্রেরণা হিসেবে যেখানে কবি নিজস্ব শৈলীতে নিজের সৃষ্টি সংক্রান্ত নিয়মাবলি তৈরি করবেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও কোলরিজের যুগ্ম কবিতা সংকলন রোমান্টিসিজমের আন্দোলনকে বেগবান করে। এর প্রথম সংস্করণ ১৭৯৮ সালে, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৮০০ সালে এবং তৃতীয় সংস্করণ ১৮০২ সালে প্রকাশিত হয়। কোনরকম নীতি, তত্ত্ব, উপদেশ কিংবা আভিজাত্যের সংশ্রব ব্যতিরেকে প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবন এবং অতি তুচ্ছ বিষয়ের মধ্যে আনন্দের উপলক্ষ খুঁজে পাওয়া কিংবা করুণতম বিষাদে নিপতিত হওয়ার মতো বিহ্বলতা যা বিস্ময়ের ঘোর তৈরি করে মূলত সেগুলোই ছিল ঐসব কালোত্তীর্ণ রোমান্টিক কবিতার নির্মাণ কৌশল। সৌন্দর্যের পূজারী কিটস (১৭৯৫-১৮২১) ক্ষণস্থায়ী জীবনের অধিকারী হয়েও আত্মগত সৌন্দর্যের সংবেদনার মধ্যে নিজেকে পুনঃআবিস্কার করে সর্বকালের কাব্যমোদীদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন। রোমান্টিক কাব্যতত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা এতটাই দৃঢ়মূলে প্রোথিত ছিল যে, পরে যখন ইমপ্রেশনিজম, সিম্বলিজম, এঙ্প্রেশনিজম, ডাডাইজম, সুররিয়ালিজম ইত্যাদি সাহিত্যতত্ত্বের আগমন ঘটেছে তাদের কোনোটিই রোমান্টিক ঘরানার কাব্যতত্ত্বের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়নি বরং পরবর্তীকালে সবগুলো তত্ত্বেই সাহিত্যস্রষ্টার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের যে সার্বজনীন মর্মবাণী রোমান্টিসিজমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে- তাকে দৃঢ়ভাবে অনুসমর্থন করে গেছে। শেলির কবিতায় নান্দনিক অভিজ্ঞতায় জীবনকে পরিপূর্ণভাবে পাবার আকাঙ্ক্ষা ব্যঞ্জনাধর্মী পংক্তিতে রূপায়িত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যও এ আন্দোলনের অভিঘাতে জেগে ওঠে। বাংলা কবিতায় নিসর্গ ঘেঁষা রোমান্টিসিজমে আক্রান্ত হতে দেখি রবীন্দ্রনাথ এবং জীবনানন্দকেও।

চার

আধুনিক (Modern) শব্দটি একটি আপেক্ষিক প্রত্যয়। যুগশ্রেষ্ঠ সাহিত্য স্রষ্টাগণ সরলীকৃত অর্থে নিজ নিজ কালে আধুনিকই ছিলেন। হোমার, শেঙ্পীয়ার কিংবা মাইকেল মধুসূদন দত্ত যার যার কালে আধুনিক কবি হিসেবে সমাদৃত ছিলেন। ‘আধুনিক’কে সাম্প্রতিক অর্থে ব্যবহার করার প্রয়োগিক অসুবিধাও রয়ে গেছে। উনিশ শতকের শিল্পবিপ্লব মানুষের দৈনন্দিন, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে নাটকীয় পরিবর্তনের সূচনা করে। দার্শনিক ক্ষেত্রে ইতিবাচকতা, বুদ্ধিবাদী ও বস্তুবাদী চিন্তাধারা এসময় প্রবল হয়ে ওঠে। আবার এর বিরুদ্ধবাদী দার্শনিক অবস্থানও কোথাও কোথাও দানা বাঁধতে থাকে। হেগেলের সভ্যতার দ্বান্দ্বিক অভিব্যক্তি বিষয়ক মতকে চ্যালেঞ্জ করেন ফ্রিডরিশ নিটশে এবং সরেন কিয়ের্কেগার্ড। প্রকৃতিগতভাবে প্রগতিশীল এ ধারণার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন নাট্যকার ইবসেন। সোপেনহাওয়ার এর মতো দার্শনিক হয়ে ওঠেন নিরাশা ও দুঃখবাদের প্রতিমূর্তি। এহেন পরিস্থিতিতে দুইজন দার্শনিকের চিন্তা মানবচিন্তন ইতিহাসের পরিক্রমায় মৌলিক প্রভাবসঞ্চারী হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ দুইজন দার্শনিক হলেন কার্ল মার্কস্ এবং সিগমুন্ড ফ্রয়েড (বাংলা সাহিত্যেও এসবের ধাক্কা ও ঢেউ পরবর্তীতে এসে লেগেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়তে গিয়ে তাই ফ্রয়েড ও মার্কস্ অবলীলায় এসে যায়)। ১৮৫০ সালে ডারউইনের অভিব্যক্তিবাদ প্রকাশিত হলে তা খ্রিস্টীয় ধর্মবিশ্বাসকেন্দ্রিক সমাজদর্শনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। স্রষ্টা সম্পর্কিত বোধের নিশ্চিন্তি ও প্রশান্তির জায়গা দখল করে অনিশ্চয়তা ও সংশয়ের অনুভব। কার্ল মার্কস্ ডারউইনের সে তত্ত্বেরই অর্থনৈতিক ভাষ্য হিসেবে উৎপাদন রীতি ও উৎপাদন সম্পর্কের অবস্থান থেকে শ্রমজীবী মানুষের পুঁজিকেন্দ্রিক শোষণ-বঞ্চনার স্বরূপ তুলে ধরেন তাঁর ‘সারপ্লাস ভ্যালু’ তত্ত্বে। অপরদিকে ফ্রয়েড-এর তত্ত্ব মানুষের অবচেতন মনে যেসব কামনা-বাসনা ক্রিয়াশীল তার সাথে ইতর-জন্তু-জানোয়ারের পার্থক্যরেখাটি ঘুচিয়ে দেওয়ায় মানুষ যে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব এবং সকল সদ্গুণের আধার সে বিদ্যমান বিশ্বাসের অপমৃত্যু ঘটে। আধুনিকতার এ বোধটি দ্রুত নগরায়নের সমবয়সী। এ প্রতিকূল পরিবেশে বীরদর্পে শুরু হয় আধুনিক কবি সিসিফাস এর যাত্রা। ১৯২২ সালে টি এস এলিয়টের কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’ এবং জেমস জয়েস এর যুগান্তকারী উপন্যাস ‘ইউলিসিস’ আধুনিকতার চেতনার সর্বকালিক প্রতিরূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিকতাবাদ একক ধারণা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও এর মর্মমূলে প্রবিষ্ট রয়েছে কতিপয় সুপরিচিত সাহিত্যতত্ত্ব প্রতীকবাদ, ইমেজিজম, ডাডাবাদ, পরাবাস্তববাদ, ইম্প্রেশনিজম, এঙ্প্রেশনিজম, ফিউচারিজম, ভর্টিসিজম, ম্যাজিক রিয়ালিজম ইত্যাদি। আধুনিকবাদী চিন্তা সাহিত্যে বৈপ্লবিক বাঁকবদলের সূচনা করে। আধুনিক কবি হিসেবে বোদলেয়ারের নাম প্রথমে এলেও গ্রাহাম হফের মতে এ গৌরব প্রাপ্য র‌্যাবোঁর। কারণ র‌্যাবোঁই কবিতার ভাষাকে পরিচিত আবহ ও সূত্র থেকে মুক্ত করার প্রয়াস পান। রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতাকে অন্তরে অনুভব করলেও দীর্ঘকালীন সমাজস্থিতির একান্ত বিশ্বাস ও নিশ্চয়তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে সেটিকে স্বাগত জানাতে পারেননি। ১৯৪০ দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নারকীয় মানবসংহারী প্রেক্ষাপটে আধুনিকতাবাদের অবসান ঘটায় তৎপরবর্তীতে শুরু হয় উত্তর আধুনিকতা বা পোস্টমডার্নিটির যুগ।

পাঁচ

জ্যাকস্ দেরিদা, মিশেল ফুকো, রলা বার্থ প্রমুখ উত্তর-আধুনিকতাবাদের প্রবক্তা। জ্যাকস্ দেরিদা তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ গ্রামাটোলজিতে বলেছেন লিখিত ভাষা মুখের ভাষার ছায়া মাত্র। তাঁর মতে উচ্চারিত ও লিখিত ভাষার সাহায্যে নির্মিত হয় লেখক বা বাচকের চিন্তার প্রতিফলন ‘টেঙ্ট্’ এবং এই টেঙ্ট্কে প্রতিনিয়ত বিনির্মাণের (deconstruction) এর মধ্য দিয়ে বিকশিত হয় নিত্যনতুন চিন্তন-অনুধ্যান। উত্তর-আধুনিকতাবাদিগণ যুক্তিভিত্তিক আন্তঃসম্পর্কের মধ্য দিয়ে বস্তু বা ঘটনাবলীকে বিশ্লেষণ করাকে সঙ্গত মনে করেন না। সমগ্রতার চেয়ে খন্ডতা বা ভিন্নতা, বৈজ্ঞানিক সঠিকতার চেয়ে অনির্দিষ্টতা বা দ্বৈততা, ঐক্যের চেয়ে পার্থক্য, অস্তিত্ববাদের চেয়ে সন্দেহবাদ বা বিনাশবাদ এবং শৃঙ্খলা বা নিয়মের চেয়ে বিশৃঙ্খলা বা Chaos এই মতবাদে বেশি গুরুত্ব পায়। মানুষের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বহমান ও খন্ডিত ধারণার উপর জোর দেয় উত্তর-আধুনিকতাবাদ। এটি ধারণা করে নেয় যেহেতু সবকিছুই বহমান ও খন্ডিত রূপে দৃশ্যমান, সেহেতু নৈতিক ও সামাজিক রীতিনীতি আরোপিত ও কৃত্রিম এবং তা অকারণে বাইরে থেকে চাপানো। এ পরিস্থিতি পাল্টানোর প্রণালীবদ্ধ কোনো ছক বা মেটান্যারেটিভকে এ মতবাদ সরাসরি অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। উত্তর-আধুনিকতাবাদিগণের মতে প্রত্যেকটি বাচন স্বতন্ত্র; কর্তৃত্বকারী বাচনের কাঠামোতে অন্তর্ঘাত ঘটানোর কর্মসূচি তারা এতে অনুমোদন করে। যেহেতু বিদ্যমান পুরুষ আধিপত্যকে খন্ডন করার জন্য সংগ্রাম আবশ্যক, এজন্য সে লক্ষ্যে গড়ে ওঠা সকল নারীবাদী (feminist) আন্দোলন এ মতবাদ কর্তৃক সর্বদা সমর্থনযোগ্য। মার্কস্বাদের বিরুদ্ধে তাদের সমালোচনা বড়ই কঠোর। তবে এ সমালোচনাগুলো তারা নতুন ভাষ্যে উপস্থাপিত করেছেন মাত্র। যেমন, মার্কসীয় নির্ধারণবাদ (Determinism) এর তারা ঘোর বিরোধী।

রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব ও নন্দনতত্ত্বের প্রতিটি ক্ষেত্রেই উত্তর-উপনিবেশবাদ (Post-colonialism) অত্যন্ত আলোচিত বিষয়। সাহিত্যতাত্ত্বিকদের মতে সাম্রাজ্যবাদি উপনিবেশের অবসানের পরে রচিত সাহিত্যকে উত্তর-উপনিবেশবাদী সাহিত্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ বিষয়ে বিল অ্যাশক্রফট্, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, এডওয়ার্ড সাঈদ প্রমুখের আলোচনায় সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদের সময়কাল থেকে অদ্যাবধি ঔপনিবেশিক শোষণ-বঞ্চনার রাজনৈতিক-সামাজিক অভিজ্ঞতা ও টানাপোড়েন এবং এসবের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ সংগ্রাম কীভাবে কলোনির মানুষদের জীবনযাত্রা, চিন্তাকাঠামো ও সাহিত্যের স্বরকে বদলে দিয়েছে কিংবা প্রাচ্যজন এবং তাদের জীবনবোধ ও সাহিত্য সম্পর্কে পাশ্চাত্যের সরলীকৃত ধারনার বিষয়ে আমরা সম্যকভাবে অবহিত হতে পারি।

ছয়

বাঙালির সাহিত্যকৃতির মহত্তম নির্মাণ আধুনিক বাংলা কবিতা। বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে বাংলা কবিতার ভাষাশৈলী, অবয়ব, ব্যাকরণ বিশেষ করে ক্রিয়াপদের ব্যবহার সর্বোপরি বিষয় প্রকরণ সময়ের পরিক্রমায় কীভাবে বদলে গেছে সেটি বিভিন্ন কালপর্বের আটজন আধুনিক কবির আটটি কবিতাংশ উদ্ধৃত করে প্রিয় পাঠকদের সামনে পরিস্ফুট করতে চাচ্ছি।

(১)

সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে

সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;

সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে

শোনে মায়া মন্ত্র ধ্বনি) তব কলকলে

জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে।

(মাইকেল মধুসূদন দত্ত : কপোতাক্ষ নদ)

(২)

ওগো, কে তুমি বসিয়া উদাস মুরতি

বিশাদশান্ত শোভাতে!

ওই ভৈরবী আর গেয়োনাকো

এই প্রভাতে

মোর গৃহছাড়া এই পথিক পরান

তরুণ হৃদয় লোভাতে।

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : ভৈরবী গান)

(৩)

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার আশোকের ধূসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

আমারে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

(জীবনানন্দ দাশ : বনলতা সেন)

(৪)

আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে

আমরা দুজনে সমান অংশীদার;

অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে,

আমাদের ’পরে দেনা শোধবার ভার।

তাই অসত্য লাগে ও-আত্মরতি

অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে

আমাকে এড়িয়ে বাড়াও নিজের ক্ষতি।

(সুধীন্দ্রনাথ দত্ত : উটপাখী)

(৫)

প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,

চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য

কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া

চিমনির মুখে শোনো সাইরেন-শঙ্খ,

গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে-

তিল তিল মরণেও জীবন অসংখ্য

জীবনকে চায় ভালোবাসতে।

(সুভাষ মুখোপাধ্যায় : মে-দিনের কবিতা)

(৬)

‘এসো সখি’ বলে বহু যুবরাজ তোমাকে সর্বদা

তেপান্তরে, নদীতীরে, কাশবনে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে

ছায়াচ্ছন্ন শাল তমালের ভিড়ে টেনে আনে

মধ্য দিনে শুনিয়েছে রাখালের বেণু। বড় বেশি

জলজ কণিকা ফুসফুসে জমেছিল ব’লে তুমি

ভুগেছো সর্দিতে খুব, এত ছিঁচকাদুনে হয়েছো

আদরিণী কাব্যলক্ষ্মী- আমাদের, এত আলুথালু।

(শামসুর রাহমান : বাংলা কবিতার প্রতি)

(৭)

সুলতা জানে, সুলতা জানে ভালো

আকাশে মেঘ- দীঘিতে কেন হাঁস,

সুলতা জানে, সুলতা জানে ভালো

কবিরা কেন নারীর ক্রীতদাস।

(সিকদার আমিনুল হক : সুলতার নিজস্ব আয়না)

(৮)

তখন আমি আমাদের অসামান্য কথাকার, মনোচিকিৎসক

মামুন হুসাইনের শরণাপন্ন হলে- তিনি আমাকে তার উপন্যাস

ও গল্পের বিভাষায় একটি টাকা আটকানোর রাবার বাঁ হাতে লাগিয়ে

চলতেফিরতে ও সময় মতো টেনে আবার শরীরে ছুঁড়ে মারতে বলেন!

তাতে আমি যেমন চিৎকার করে সুস্থ হয়ে উঠি

তেমনি দিন দিন মামুন হুসাইনের অন্ধ ভক্ত হয়ে-প্রতিদিন তার

কোলেপিঠে চড়ে মিশেল ফুকোর বেবাক গল্প শুনি

(ওবায়েদ আকাশ : মিশেল ফুকো ও মামুন হুসাইনের চিকিৎসাপদ্ধতি)

প্রথাবিরোধী লেখক, কবি ও ভাষাতাত্ত্বিক হুমায়ুন আজাদ-এর মতে আধুনিক বাংলা কবিতা পাশ্চাত্য-উদ্ভূত ‘আধুনিকতাবাদ’-এর বঙ্গীয় রূপ। আদর্শবাদী ঋষি রোমান্টিক রবীন্দ্রনাথের সর্বব্যাপি প্রভাব-বলয়ের বাইরে এসে ব্যক্তিগত জীবনবোধের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত এবং বাস্তবতার কামারশালায় লৌহতপ্ত ও শাণিত সত্যিকারের আধুনিক কাব্যভাষার স্বতন্ত্রস্বর নির্মাণের অঙ্গীকারে ত্রিশের দশকের পঞ্চপান্ডব- বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দ দাশ ও অমিয় চক্রবর্তী বৈপ্লবিকভাবে বদলে দিয়েছেন বাংলা কবিতার মিলনান্তিক ও সুপ্রচল সাঙ্গীতিক কাব্যস্বর। সে ধারাক্রমেই বিগত সাত দশকের সংবেদনশীলতাকে আত্মস্থ করে বিষয় প্রকরণ, ভাষাশৈলী, কাব্যাঙ্গিক স্থাপত্য, ছন্দবদ্ধতা ও গদ্যস্পন্দ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নানামুখি নান্দনিক নিরীক্ষা ও ভাংচুর-এর মধ্য দিয়ে বর্তমানের বাংলা কবিতা সমসাময়িক আন্তর্জাতিকতার অনুবর্তী হতে পেরেছে।

সাত

এই যে জগৎসংসারের প্রয়োজন-অপ্রয়োজনকে একপাশে সরিয়ে রেখে চারদেয়ালের মাঝখানে স্বভাষা ও বিশ্বসাহিত্যের বইয়ের আবহে বসে আমরা সাহিত্যের আড্ডায় মিলিত হয়েছি সেটি মূলত সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ এবং ভালবাসা থেকে উৎসারিত। সাহিত্যের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষক ক্ষমতা রয়েছে বলেই লেখক ও পাঠক নিজের অজান্তেই সৃজন ও পাঠানুভূতি একে অপরের সাথে বিনিময় করে অনির্বচনীয় আনন্দ লাভ করে। সাহিত্য শব্দটির ধাতুমূল ‘সহিত’ থেকে উদ্ভূত। যার মধ্যে সকলকে সংযুক্ত করার আহ্বান ও তাগিদ রয়েছে। ভোগসর্বস্ববাদিতা ও সর্বগ্রাসী পণ্যায়নের এ যুগে সাহিত্যের প্রতি আমাদের অনুরাগ এবং মনোযোগ নষ্ট করবার নানামুখি চটকদার আয়োজন ও বিভ্রান্তিকর আহ্বানও রয়েছে। কিন্তু সাহিত্যের অন্তর্নিহিত শক্তি এমন- সে পাঠকের মনে এক অদৃশ্য চৌম্বকীয় আবেশ তৈরি করে নিজস্ব স্বরে। শব্দের বিন্যাসে ভাষিক সৌকর্যেই ঐ নিজস্ব স্বরের নির্মিতি। প্রকৃতপক্ষে আত্মসৃজনের মধ্যেই এ নির্মিতির সূচনা। রবীন্দ্রনাথ বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে- বাইরের জগৎ মানুষের হৃদয়াভ্যন্তরে প্রবেশ করে একটা আলাদা পৃথিবী হয়ে উঠেছে- কারণ আমাদের ভালোলাগা এবং মন্দলাগাও তার সঙ্গে জড়িত। মানুষের মনের মধ্যে এই যে জগৎ, তাকে পুনর্বার বাইরে প্রকাশ করা হলেই নিজের অপরূপ পরিচয় নিজেই তুলে ধরা হয়। হৃদয়জগৎ আপনাকে ব্যক্ত করবার জন্য সদাসর্বদা ব্যাকুল এবং এই ব্যাকুলতাতেই সাহিত্যের সৃষ্টি, এই ব্যাকুলতাতেই মানুষ প্রতিনিয়ত সৃজন করে চলেছে নিজেকে।

সাহিত্যকর্মের নির্মিতি একটি ধারাবাহিক সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া। এটি যে সবসময় সচেতনভাবে ঘটে তাও নয়, অনেক সময় আচম্বিতেও একটি মহৎ সাহিত্যকর্মের সৃজন প্রক্রিয়ার সূচনা হতে পারে। সাহিত্যস্রষ্টাকে তার সৃষ্টিশীলতার স্বার্থেই মেেনাযোগী পাঠক হতে হয়। পূর্বজ নমস্যজনের সাহিত্যকৃতির পাঠ থেকে নন্দনতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়, গ্রহণ করতে হয় নিত্যনুতন সৃষ্টির প্রেরণা। নিজের রচনাবলির পুনর্পাঠও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাকে পরিশীলন ও পরিশুদ্ধতার পথে পরিচালিত করে। রবীন্দ্রনাথসহ মহান সাহিত্যস্রষ্টাগণের পা-ুলিপি এবং সেসবের ওপর কাটাকুটি ও পরিমার্জনার ঘনঘটা দেখে আমরা উপলদ্ধি করতে পারি যে, একটি মহৎ সাহিত্যকৃতির নির্মাণের পেছনে থাকে ক্রমাগত ভাঙচুরের অলিখিত ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ তো তার কোনো কোনো লেখার ওপর এমন নান্দনিক কাটাকুটি চালিয়েছিলেন যে, পরে দেখা গেলো সেসবের কোনো-কোনোটি ছবির রূপ পরিগ্রহ করেছে। সাহিত্যস্রষ্টাকে শিল্পের অন্যান্য মাধ্যম যেমন-চিত্রকলা, ভাষ্কর্য, সঙ্গীত, নৃত্যকলা ইত্যাদি থেকেও সৌন্দর্যের পাঠ গ্রহণ করতে হয়। শিল্পকলার নন্দনতাত্ত্বিক ইতিহাসও সাহিত্যের সাথে সমান্তরালে বিকশিত হয়েছে। একে অপরের কাছ থেকে গ্রহণ-বর্জনের মধ্যদিয়ে তারা প্রত্যেকেই নিজেদেরকে নন্দনতাত্ত্বিকভাবে পরিপুষ্ট করবার প্রয়াস পেয়েছে।

আট

জীবনের অর্জিত অভিজ্ঞতা নানারূপে ব্যক্ত হয় শিল্পমাধ্যমের সন্দর্ভে। সাহিত্যের পাঠকৃতিতে নিরন্তর ভাঙাগড়ার বয়ানে বদল হচ্ছে সাহিত্যতাত্ত্বিক ইতিহাস। ইতিহাসতো তাকেই বলবো যা অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের সেতু নির্মাণ করে আর এর মধ্যস্থতায় থাকে বর্তমান। যাপিত জীবনের বহুরৈখিক অভিজ্ঞতা, দৃষ্টির বহুকৌণিকতা আর আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক জীবনের টানাপোড়নে সাহিত্যস্রষ্টা প্রতিনিয়ত জীবনকে নির্মাণ করে যান বিনির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এ পর্যায়ে পাঠকের প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তুতকৃত পাঠপ্রতিবেদনে হস্তক্ষেপ করে তিনি প্রান্তিকায়িত উচ্চারণকে নিয়ে আসতে পারেন কেন্দ্রে। সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে যখন ভাবি, এ প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম বিবেচনা করতে হয় প্রতিবেদনের প্রাপক হিসেবে আমাদের অর্থাৎ পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গির অবস্থান। তা না হলে আমাদের এ পাঠ হয়ে যেতে পারে ছদ্মপাঠ কিংবা অশুদ্ধ পাঠ। সাহিত্যের পাঠক হিসেবে পাঠকৃতির সারবত্তা, প্রকরণ ও ভাষাশৈলি ইত্যাদির মধ্যে অর্ন্তনিহিত দ্বিবাচনিকতা বিশ্লেষণ করেই আমাদেরকে অগ্রসর হতে হবে। পুনর্পাঠের মধ্য দিয়ে পরিশীলনের পথে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে সাহিত্যমাধ্যমের ক্রমিক বিবর্তনের পাঠ নিতে হবে বাখতিনের ‘dynamic relation between authorial discourse and discourse of the other’ যুগান্তকারী ভাষ্যের আলোকে। কেননা, কোনো বিশেষ কালপর্বে বিশেষ কোনো সাহিত্যমাধ্যমে বিশিষ্ট রচনাশৈলি গড়ে ওঠে লেখকের নিজস্ব উচ্চারণ এবং তার বিপরীতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা থেকে অর্জিত ছোটবড় অপরসত্তার দ্বান্দ্বিক দ্বিবাচনিকতা থেকে। লেখকের পরিকল্পিত সন্দর্ভে অপরসত্তার সমান্তরাল উপস্থিতিতে প্রতিনিয়তই চলে নিত্যনতুন হস্তক্ষেপ। সেজন্য সময়ান্তরে পুরনো বক্তব্য যেমন অবান্তর হয়ে পড়ে, রচনাশৈলিতে আসে আমূল রূপান্তর।

নয়

শেষের কথা:

সময়ের পরিক্রমায় নদীর স্রোত ও গতিপথ পরিবর্তিত হয়। ক্রমাগতভাবে ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে নদী তার অস্তিত্বমানতাকে অর্থবহ করে তোলে। একই সমান্তরালে সময়ের স্রোতধারায় সাহিত্যের টেঙ্ট্ও পরিবর্তিত হতে থাকে। নতুন নতুন বিষয় প্রবণতা ও ঝোঁক সাহিত্যে পরিদৃষ্ট হয়। ভাষায় সংযোজিত হয় নতুন নতুন শব্দ। জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুষঙ্গের সাথে সম্পর্কিত অনেক শব্দের মৃত্যু ঘটে কালের প্রবাহে। আবার অনেক শব্দ বহু ব্যবহারে জীর্ণশীর্ণ হয়ে হারিয়ে ফেলে নিজস্ব আবেদন। ভাষার ব্যাকরণ এবং লিখিতরূপেও আসে পরিবর্তন। মুখের ভাষা বদলে যাওয়ার প্রেক্ষাপট তো রয়েছেই। সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যুদ্ধবিগ্রহ ও বিশ্বায়ন ভাষা ও সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধিতে যেমন ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, আবার এর উল্টোপিঠও রয়েছে। কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হয় অবদমিত; ক্ষমতাহীন ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সাহিত্যের বিলোপ ঘটে রাজনৈতিক-সামাজিক কারণে। এক ভাষার সাহিত্য অন্য ভাষায় অনূদিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সেই ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পাঠকের আগ্রহ বাড়ে এবং এর ফলে উভয় ভাষায়ই পারস্পরিকভাবে নিজেদেরকে পরিপুষ্ট করার সুযোগ পায়। এর মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অধিকতর যোগাযোগের মধ্যদিয়ে জাতিসমূহের বৃহত্তর কল্যাণ বয়ে আনে। সবশেষে বলবো, পুরোনো পাঠকৃতিকে ভেঙ্গে আকর্ষক টেঙ্ট বিনির্মাণে নতুন প্রজন্মের লেখকদের নিরীক্ষা প্রবণতার মধ্যদিয়ে অগ্রসর হতে হবে। ক্লাসিক এবং সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের নিবিড় পাঠে নিমগ্ন রাখতে হবে নিজেদের। এক্ষেত্রে সাহিত্যতত্ত্বের পাঠেও সমধিক গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, সাহিত্যতত্ত্বের মৌল-জ্ঞান সাহিত্যিককে গভীরতর অনুসন্ধানে প্ররোচিত করে এবং তা থেকে লেখায় নতুন ভাবনা ও শৈলি সংযোজিত হয়। নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি এবং লোকজ উপাদান ও স্থানীয় মিথ থেকেও সারাৎসার সংগ্রহ করে স্বভাষার সাহিত্যে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। অপ্রচলিত ও ধারহীন শব্দগুলোকে সমসাময়িক প্রসঙ্গে বারবার ব্যবহার করে নতুন নতুন অর্থ ও ব্যঞ্জনা সৃষ্টিতে প্রয়াসী হতে হবে। প্রগতিবাদী ও সংস্কারমুক্ত চিন্তন-পরিসর বৃদ্ধি করতে হবে। সর্বোপরি, সময়-দেশ-কাল-পাত্রভেদে সাহিত্যের সার্বজনীনতা অক্ষুণ্ন রেখে নিত্যনতুন নির্মাণ-বিনির্মানের মধ্য দিয়ে সাহিত্যের স্বতন্ত্র স্বর সৃষ্টিতে প্রয়াসী হতে হবে নবীণ প্রজন্মের সাহিত্যকর্মীদের। সাহিত্যের জয় হোক, জয় হোক প্রতিস্রোত ও শালুকের।

*১০ মে ২০১৮, পাঠক সমাবেশ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত শালুক আয়োজিত সাহিত্যসন্ধ্যা প্রতিস্রোত ২-এ মূল প্রবন্ধ হিসেবে পঠিত।

  • শওকত ওসমানের অগ্রন্থিত কবিতা

    মুখোমুখি

    newsimage

    সম্প্রতি বাংলা সাহিত্যের এক কর্মী জনাব ভূঁইয়া ইকবাল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জদুঘরের আবদুল

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    তিনটি কবিতা আনোয়ারা সৈয়দ হক তুমুল সিম্ফনি আজ তুমুল সিম্ফনি আজ আকাশে বাতাসে ঘোর অন্ধকারে

  • নিমগ্ন ও নির্লিপ্ততার কবি হায়াৎ সাইফ

    জুনান নাশিত

    newsimage

    কবি হায়াৎ সাইফের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সন্ত্রাসে সহবাস’। ‘ওয়্যার অন টেরর’, ‘টেরোরিস্ট’ এসব

  • অসম্পূর্ণ গল্প (পর্ব ৩)

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) পঞ্চম অধ্যয় লোকটাকে বুকের উপর থেকে ঠেলে উঠায় নাইমুন। সুযোগ পেয়ে

  • ২০১৯ সালে প্রকাশিত দশটি গ্রন্থ

    newsimage

    শরীর সংক্রান্ত কূটালাপ মামুন হুসাইন মামুন হুসাইন তাঁর সমকালের কথাশিল্পীদের মধ্যে স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র বিষয়ে,

  • জিগমে সিংগায়া ওয়াংচুক!

    আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

    newsimage

    প্রথম যখন ভুটানে যাই তখন অপির (আমার বর) উপর একটু বিরক্ত হয়েছিলাম।

  • সাহিত্যে নতুন স্বর নির্মাণের প্রত্যয়ে

    শালুক-সাহিত্যসন্ধ্যা ‘প্রতিস্রোত’-২

    কামরুল হাসান

    newsimage

    শালুক-সাহিত্যসন্ধ্যা প্রতিস্রোত ২-এর নির্ধারিত তারিখ ছিল গত ১০ মে বেলা দুইটায়। আমি