• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৬ মে ২০১৮, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৯ রমজান ১৪৩৯

মুস্তাফা নূরউল ইসলামের সুদীর্ঘ যাপন

ওবায়েদ আকাশ

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৭ মে ২০১৮

http://print.thesangbad.net/images/2018/May/16May18/news/Untitled-10.jpghttp://print.thesangbad.net/images/2018/May/16May18/news/Untitled-12.jpgশিক্ষাবিদ, সম্পাদক, সাংবাদিক ও ব্যতিক্রমী ধারার বিশিষ্ট লেখক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম তাঁর দীর্ঘ ৯২ বছরের জীবনে বাঙালি সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিচরণক্ষেত্রগুলোতে প্রহরীসম দেদীপ্যমান ছিলেন। তাঁর এই দৃষ্টিবিস্তৃতির দৈর্ঘ্য জীবনের অন্তিম দিনগুলোতেও অবিচল ও তৎপর ছিল। বাঙালি সংস্কৃতি, বাঙালিত্ব ও দেশপ্রেমের চেতনায় জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ করে তুলতে চেয়েছিলেন।

মুস্তাফা নূরউল ইসলাম যতটা অগ্রণী হয়ে আমাদের সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবোধের মহত্ত্বে নিজেকে স্থাপন করেছিলেন, ততটুকু তাঁকে আবিষ্কার করা যায়নি। তিনি তাঁর জীবনকে নানা মাত্রায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। জাতীয় চেতনার অভাবগুলোকে যথার্থ শনাক্ত করে নিজে সেখানে কর্মীর ভূমিকায় থেকে অভাব পূরণে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করেছেন। এ কারণে আজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- কর্মক্ষেত্রে তার বিচরণের এলাকাগুলো কতটা বহুধা বিস্তৃত ছিল। দৃশ্যত শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে জাতীয় অধ্যাপকের সম্মান দেয়া হলেও মূলত তাঁর শিক্ষকতা জীবন গতানুগতিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, একাডেমিক বৃত্তে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল আলোয় ভরপুর। কখনো সৃজনমুখর, কখনো স্বপ্নবিলাসী। শিক্ষাক্ষেত্রে সৃজনশীলতা ও মননশীলতা প্রতিষ্ঠায় তার উদ্যম ও আগ্রহ তাঁর অন্যান্য কার্যক্রমে ছড়িয়ে আছে। তিনি শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের কাছে ছিলেন অন্য রকম এক অভিভাবকের ভূমিকায়। লেখাপড়া শেষ করে তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরুই করেছিলেন সাংবাদিকতার মতো জনসচেতনতামূলক পেশা দিয়ে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রাচীনতম ‘দৈনিক সংবাদ’-এর প্রথম সংখ্যা থেকেই তিনি কাজ শুরু করেছিলেন ১৯৫১ সালে। কাজ করেছেন দৈনিক ‘মিল্লাত’ পত্রিকায়। তারপর পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতাকে। অর্থাৎ আমাদের সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক ও চেতনা জাগানিয়া পদক্ষেপগুলোতে সবসময় যাতে নিজেকে নিয়োজিত রাখা যায় সেজন্য তিনি সহায়ক পেশাগুলোকে বেছে নিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতেও কাজ করেছেন ব্যক্তিগত মহত্ত্ব অটুট রেখে। যেমন শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় জাদুঘরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন যথার্থই যোগ্য মানুষের ভূমিকায়।

http://print.thesangbad.net/images/2018/May/16May18/news/Untitled-13.jpgআজকের দিনে গভীরভাবে ভেবে দেখলে আমাদের শিল্প সংস্কৃতির উত্থানের দিনগুলোতে তিনি কাজ করেছেন একজন মৌলিক ক্রিয়েটরের ভূমিকায়। সাংবাদিকতা ছেড়ে দিলেও তিনি সম্পাদনার ক্ষেত্রে আরো তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কাজ করতে শুরু করেন। তিনি সাময়িকপত্র সম্পাদনার গুরুত্ব অনুধাবন করেন। ‘সুন্দরম’ নামে একটি সাময়িকপত্র সম্পাদনার কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। লেখক ও সাহিত্যের উৎকর্ষে ‘সুন্দরম’ এখনো উদাহরণ হয়ে আছে। সুন্দরমের পুরনো সংখ্যাগুলো আজকের গবেষণা ও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। দীর্ঘদিন বিরতির পর তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর আগে তিনি নবপর্যায়ে ‘সুন্দরম’ প্রকাশেরও কাজ শুরু করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য সাময়িকপত্র ‘পূর্বমেঘ’ ও ‘অগত্যা’র সম্পাদনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

বাহ্যত এত কিছুর সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি মূলত নিজেকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত রেখেছেন লেখালেখির সঙ্গে। জাতীয় পত্রিকা, সাময়িকপত্র, সাহিত্যপত্রে নিয়মিত তিনি বাঙালি সংস্কৃতি ও সমসায়িক অবক্ষয়গুলোকে তুলে ধরতেন। তার সমাধানের পথ খুঁজতেন। লেখক হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন অগ্রগণ্য, তেমনি তাঁর আলাদা ও সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী গদ্যভাষার কারণে তিনি লেখক সমাজে বিশেষ সম্মানের আসন পেয়েছিলেন। তাঁর ‘সময়ের মুখ তাহাদের কথা’ ও ‘নিবেদন ইতি’ নামের আত্মজৈবনিক রচনা দিয়ে আবিষ্কার করা যায় যে, তিনি ছিলেন একজন কালের সাক্ষী। একজন বর্ষীয়ান শিক্ষক, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি অনেক কিছুই প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ করেছেন, যা একালের জন্য এক পরম বিস্ময়।

তিনি ছিলেন আমাদের আজকের লেখক-বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর গুরুস্থানীয়। যেমন শিক্ষকতায়, তেমন গবেষণা-সম্পাদনায় এবং সর্বোপরি লেখালেখি ও নতুন গদ্যভাষা সৃষ্টিতে তো বটেই। তাঁর গদ্যের মোহ এড়ানো যায় না। একবার পড়তে বসলে শেষ না করে উপায় থাকে না। ভাষায় এমন মোহজাল সৃষ্টিকারী লেখক সচরাচর চোখে পড়ে না। তাঁর বাবা সা’দত আলী আখন্দ ছিলেন একজন বিশিষ্ট লেখক। হয়তো জন্মসূত্রেই নূরউল ইসলাম এতটা মেধাবী লেখক হতে পেরেছিলেন। সব মিলিয়ে তিনি অর্ধশতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন।

এসব কিছুর পাশাপাশি তাঁর আর একটি উজ্জ্বল দিক তাঁকে ও আমাদেরকেও আলোকিত করেছে- সেটি হলো টেলিভিশন উপস্থাপনা। সাহিত্য সংস্কৃতি ঐতিহ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘মুক্তধারা’, ‘কথামালা’, ‘বাঙালির বাংলা’ নামে বেশ কিছু অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। তাঁর উপস্থাপনাভাষ্যে যথার্থই ফুটে উঠত তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বিশুদ্ধ পরিচ্ছন্ন রুচির আভাস।

তাঁর ব্যক্তিত্বের অসাধারণ দৃঢ়তাই শুধু ছিল না, রসবোধ ও মানুষকে আকর্ষণের ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ। তাঁর ছিল এক বর্ণাঢ্য জীবন। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনে সে সময়ের একজন সচেতন সাংবাদিক ও কর্মী হিসেবে তিনি বিশিষ্ট ভূমিকা রাখেন। তিনি একসময় জড়িয়ে পড়েছিলেন নাট্যান্দোলনের সঙ্গেও। উপস্থাপনা ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে তিনি যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতেন তা ছিল সব সময় ব্যতিক্রম ও আবেদন সৃষ্টিকারী। তিনি সারা জীবন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে ভেতরে ভেতরে সমাজকে বদলে দেবার চিন্তায় কাজ করতেন। এজন্য তিনি সবসময় প্রচলিতকে এড়িয়ে চলতেন, গড্ডল প্রবাহকে কখনো পাত্তা দেননি।

মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বগুড়ার মহাস্থানগড় সংলগ্ন চিঙ্গাশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সা’দত আলী আখন্দ, তাঁর মায়ের নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি ছিলেন মা-বাবার জ্যেষ্ঠ সন্তান। নূরউল ইসলাম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় থেকে স্নাতকোত্তর ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন। শৈশব থেকেই সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ।

শিক্ষকতা করেছেন সেন্ট গ্রেগরিজ কলেজ, পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫১ সালে সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। ১৯৫৩-৫৪ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যুক্ত হন।

তিনি ১৯৮১ সালে একুশে পদক, ১৯৮২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং সাহিত্য ও শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০১০ সালে বেসামরিক সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয়http://print.thesangbad.net/images/2018/May/16May18/news/Untitled-14.jpg সম্মাননা স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। ২০১১ সালে তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

এ যাবত প্রকাশিত তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে আছে- মুসলিম বাংলা সাহিত্য (১৯৬৮), নজরুল ইসলাম (১৯৬৯), বাংলাদেশে মুসলিম শিক্ষার ইতিহাস এবং সমস্যা (অনু. ১৯৬৯), মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লা (১৯৭০), সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত (১৯৭৭), আমাদের মাতৃভাষা চেতনা ও ভাষা আন্দোলন (১৯৮৪), বাংলাদেশ বাঙালী আত্মপরিচয়ের সন্ধানে (সম্পা. ১৯৯০), আমাদের বাঙালিত্বের চেতনার উদ্বোধন ও বিকাশ (১৯৯৪) ইত্যাদি।