• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫, ৭ রবিউল সানি ১৪৪০

সিকদার আমিনুল হক সম্পর্কে

বাল্যবন্ধু পীযূষকান্তি সাহা

সাক্ষাৎকার

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

image

[কবি সিকদার আমিনুল হকের ডাকনাম দীপক। দীপকের বাল্যবন্ধু পীযূষকান্তি সাহা। বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ড প্রবাসী। ১৯৫২ থেকে ২০০৩ সালের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন দীপকের ছায়াসঙ্গীর মতো। সারাক্ষণ যোগাযোগ হতো দুজনের। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি সিকদার আমিনুল হককে দেখেছেন-জেনেছেন। সম্প্রতি ওবায়েদ আকাশের কিছু প্রশ্নের জবাবে তিনি শুনিয়েছেন দীর্ঘ সময়ে দেখা দীপকের জীবনের নানান প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গের কথা। শুনিয়েছেন দীপকের শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা, বেড়ে ওঠা থেকে বিরল প্রতিভার কবি হয়ে ওঠার নানান কাহিনি]

ওবায়েদ আকাশ : কত বছর বয়স থেকে আপনি তাঁকে চেনেন?

পীযূষকান্তি সাহা : আমার ১৫ বছর বয়সে (১৯৫২ সালে) দীপকের (সিকদার আমিনুল হক) সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ হয় মুন্সীগঞ্জ (ঢাকা) উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র হিসেবে। ওর পিতা বেলাল উদ্দিন সিকদার মুন্সীগঞ্জের ছোট শহরের শ্রীপল্লী নামে আবাসিক এলাকায় পরিবারের বাসস্থান স্থাপন করেন দীপকের মাতৃকুলের জন্মস্থান হিসেবে।

ও. আ. : তিনি কেমন প্রকৃতির মানুষ ছিলেন? অন্যদের থেকে তাঁর পার্থক্য কোথায় ধরা পড়ত?

পী. সা. : স্কুলের ও ছাত্র জীবনের অতীত স্মৃতি রোমান্থনে আমার যতদূর স্মরণে আসে, দীপক অতি সহজ, সরল এবং শান্ত প্রকৃতির ছেলে ছিল। ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি সে ঐ বয়সেই বন্ধুবান্ধবদের আপ্যায়ন করতে পারলে খুব খুশি হতো। খেলাধুলা এবং অন্যান্য বিষয়ে অল্প সময় ব্যয় করে, বেশিরভাগ সময়ই ব্যয় করত বই পড়ায়। মুন্সীগঞ্জের পাবলিক লাইব্রেরির সদস্য হিসেবে বাংলা এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর বই সংগ্রহ করে নিয়মিত বই পড়ত। ঐ সময়ে আমি এবং পাড়ার অন্যান্য সমবয়সী বন্ধুরা ওদের বাড়ির সম্মুখেই খুব সুন্দর উন্নতমানের একটি পুকুরে যখন সাঁতার কাটতাম, তখন দীপক একটি বই হাতে পুকুর পাড়ে সবুজ ঘাস অথবা শান বাঁধানো ঘাটে বসে আমাদের সাঁতার ও বিভিন্ন কর্মকা- উপভোগ করত। প্রতি শুক্রবারে স্কুলের ছুটির দিনে কদাচিৎ অতি অল্প সময়ের জন্য ওকে আমরা পুকুরে নামাতে পারতাম। বেশি সময় ধরে জলে থাকায় সর্দি, কাশি এবং জ্বর ইত্যাদিতে আক্রান্তের ভয় ওর মধ্যে কাজ করত।

ও. আ. : আপনাদের দুজনের বন্ধুত্ব কীভাবে তৈরি হয়?

পী. সা. : আমি ফুটবল, ব্যাডমিন্টন এবং সাঁতার কাটার জন্য বেশিরভাগ সময়ই শ্রীপল্লীতে কাটাতাম। দীপক ঐ সময় আমাদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ না দিলেও নিয়মিত একটি বই হাতে নিয়ে উপস্থিত থাকত এবং খেলাধুলার অবসরে কংক্রিটের তৈরি শান বাঁধানো শ্রীপল্লীর সেই পুকুরের ঘাটে বেশ কিছুক্ষণ বিভিন্ন বিষয়ে গল্প, হাসিঠাট্টা হতো।

অন্যান্য বন্ধুরা চলে গেলে, মাঝে মাঝে দীপক বলত পীযূষ চল আমাদের ঘরে পানি খেয়ে যা। মাঝেমধ্যে ওদের ঘরের তৈরি পিঠাও হাজির করত ২/১ গ্লাস পানির সাথে। ১৯৫৫ সালে মুন্সীগঞ্জের জমিদার পাড়ায় যুবসংঘের উদ্যোগে ২৫ বৈশাখ উদযাপনে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে দীপক ও আমাকে দুটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রায় এক মাস প্রতি সপ্তাহে ৫/৬ দিন সন্ধ্যা ৬-৮টা পর্যন্ত রিহার্সেল হতো। তখন থেকেই আমরা দুজনে একই সাথে যাতায়াত করতাম নাটকের প্রস্তুতি পর্যায়ে। তখন থেকেই আমাদের দুজনের ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়।

ও. আ. : সিকদার ভাই কখন থেকে কীভাবে কবিতা লেখা শুরু করলেন?

পী. সা. : আমার যতদূর স্মরণে আসে সে আমার বাল্যবন্ধু দীপক তথা কবি সিকদার আমিনুল হক স্কুলজীবনেই অষ্টম/নবম শ্রেণিতে পড়াকালীনই বাংলা ভাষার মর্যাদার ওপর পড়াশোনা শুরু করে। ১৯৬৫ সনে মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালীন আমরা দুজনে কলেজ এলাকা থেকে কিছু দূরে বিকেল বেলায় যখন ঘুরে বেড়াতাম তখন নিভৃত স্থানে সবুজ ঘাসের উপর বসে ধূমপান করতাম। তখন দেখেছি দীপক নিজের বানানো ছোট ছোট ছড়া কবিতার ন্যায় আবৃত্তি করে শুনাত। মাঝেমধ্যে আমি ঠোকর দিয়ে বলতাম তুই কি রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের মতো কবি হওয়ার আশা করিস? ঐ সময়টাতে দীপক আমাকে বছরের ৩/৪ বার ঢাকায় পাঠাত কিছু বাংলা কবিতা ও সাহিত্যের বই কেনার জন্য। আমি তখন ঢাকার বাংলাবাজারের বিভিন্ন বইয়ের দোকান ঘুরে ঘুরে ওর ফর্দ অনুযায়ী বই কিনে নিয়ে যেতাম মুন্সীগঞ্জে। তখন থেকেই দেখেছি, দীপক আমাদের হরগঙ্গা কলেজের দেয়াল পত্রিকায় ছোট আকারের কবিতা লিখত। আমার স্মরণে আসে, ১৯৬০ থেকে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, মাঝে মাঝে তৎকালীন এলিফ্যান্ট রোডের ওদের বাড়িতে যেতাম। অনেক কিছুর ভেতর লক্ষ্য করেছি, ওর শোবার ঘরের এক কোনায় একটি টেবিলের উপর বাংলা কবিতা, উপন্যাস ও সাহিত্য গ্রন্থের স্টক, এবং ২/৩টি খাতায় অনেক কাটা-ছেঁড়া বাংলা কবিতার খসড়া। সপ্তাহে ৩/৪ দিন সন্ধ্যায় আমি যেতাম ওর এলিফ্যান্ট রোডের বাড়িতে। সেখান থেকে ওর সাথে যেতাম নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানের ব্লকে এক চা-কফি হাউসে। এখান থেকেই জমে উঠত ৬০ বছর আগের নব্য কবি-সাহিত্যিকদের আসর। এভাবে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াকালীন আমার বাসস্থান আর্মানিটোলা থেকে রিকশায় যাতায়াত করতাম দীপকের সঙ্গদানে। আমি যদিও বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলাম, কিন্তু ভালোভাবেই উপলব্ধি করতাম দীপকের কবিতা লেখার উপর গভীর আকর্ষণ এবং কবি পরিচয়। ঐ সময় লক্ষ্য করেছি ২/৩টি বইয়ের দোকান এবং পাবলিশারদের সঙ্গে ওর আলোচনা এবং ঘনিষ্ঠতা স্থাপনের উদ্যোগ।

ও. আ. : জীবন সম্পর্কে তার ভাবনাটা কেমন ছিল?

পী. সা. : আমি ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্য করেছি, হরগঙ্গা কলেজে অধ্যয়নকালীন আমরা যখন মাঝেমধ্যে নিকটতম বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে আলোচনা করতাম- আমি উদ্ভিদ বা প্রাণিবিদ্যায় মনোনিবেশ করে শিক্ষকতা বা গবেষণায় যাওয়ার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করতাম; আর তখন বন্ধু দীপক নীরব থাকত। সেই ১৯৫৬-৫৮ সালের দিকে হরগঙ্গা কলেজের বাংলার প্রফেসর জনাব আলিমুজ্জামানের সাথে শ্রদ্ধাভরে দীপক নিকটতম হতে সচেষ্ট থাকত। সচ্ছল পরিবার থেকে এসেছিল দীপক। ঐ সময় অন্যদের মতো বন্ধু দীপকের ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রায় তেমন কোন বিশিষ্ট পেশাগত দিক দিয়ে অর্থ উপার্জনের ভাবনা ছিল না। ও তখন বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা, কবি সাহিত্যিকদের সংগঠন এবং সর্বোপরি আমাদের বাংলা একাডেমির সাথে ঘনিষ্ঠতার উদ্যোগ নেয়ার ব্যস্ততায় থাকতে দেখেছি।

ও. আ. : ছাত্র হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন?

পী. সা. : দীপকের বাবা তৎকালে পূর্ব-পাকিস্তান রেলওয়ের প্রকৌশলী (Senior Engineer) ছিলেন বিধায় বন্ধু দীপক লাকসাম থেকে Elementary School-এ অধ্যয়ন শেষে আমাদের মুন্সীগঞ্জ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে (Munshiganj High English School) ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে সর্বদা বাংলা ভাষাবিষয়ক শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে বন্ধু দীপক অগ্রসর থাকত ক্লাসের অন্য ছাত্রদের তুলনায়। উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত বেশিরভাগ ছাত্রদের মতো দীপকের তেমন কোন বিলাসবহুল জীবনের উচ্চাকাংক্ষা ছিল না। তাই বিএ ডিগ্রি লাভের পর পুরোপুরি কবিতা লেখা ও প্রকাশনার সাথে ৩০টি বছর সম্পূর্ণভাবে নিয়োগ করে গেছে; ৬২টি বছর জীবিত থাকা অবস্থায়। আমার ঘনিষ্ঠতায় দেখেছি দীপকের তেমন কোন আকাংক্ষা ছিল না অন্যদের মতো কৃষিবিদ, ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষকতা ইত্যাদি পেশার ওপর।

ও. আ. : তার দুরন্ত দিনগুলো যা আপনি দেখেছেন, সে দিনগুলোর কথা একটু বিস্তারিত বলুন।

পী. সা. : ১৯৫২-১৯৫৯- এ সময়টাতে আমার ও আমাদের সমবয়সীদের সাথে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা, সাঁতার কাটা কিংবা শীতের দিনে ১০-১৫ বছরের ছেলেদের জন্যে বার্ষিক স্পোর্টস প্রতিযোগিতায় ওকে বেশি পাওয়া যেত না।

হ্যাঁ! তৎকালে ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগনার মহকুমা শহর মুন্সিগঞ্জে স্কুল, কলেজ এবং যুবসংঘের আয়োজনে কবিতা পাঠের আসর ও নাটকে যোগদান করত ও। আমি ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৯ সালের ভেতর ৮টি নাটকে অংশগ্রহণ করার সময় কবিবন্ধু দীপক ‘ডাকঘর’, ‘কঙ্কাবতীর ঘাট’ এবং ‘কেরানী জীবন’ নাটকে অংশগ্রহণ করেছিল।

ও. আ. : কীভাবে তার কবি পরিচিতি আসে?

পী. সা. : ১৯৫৪ থেকে ১৯৬০ সালের ভেতর দেখেছি দীপক সবসময় বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন ও প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং অন্যান্য বার্ষিক দিবস উপলক্ষে কবিতা পাঠের আসরে অংশগ্রহণ করত। অতি আবেগভরে কবিতা পাঠ করত। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৬০-এর দিকে দীপক ছোট্ট আকারের একটি কবিতার বই প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে ইত্তেফাক ও অন্যান্য বাংলা পত্রিকার ম্যাগাজিনে ওর কবিতা প্রকাশিত হয়ে থাকে। তারপর থেকেই কবি হিসেবে পরিপূর্ণ পরিচিতি আসে। এরপর বেশ কয়েকটি উচ্চমানের কবিতার বই প্রকাশ করে। প্রথমদিকের প্রকাশিত একটি কবিতার বই (নামটি স্মরণে আসছে না) সে তার বাল্যবন্ধু প্রশান্ত পীযূষের নামে উৎসর্গ করে।

১৯৬৫/৬৬-এর দিকে দেখেছি দীপক আমাদের বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করল। ওপার বাংলার বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট কবির খুব কাছের মানুষ ছিল আমার বাল্যবন্ধু কবি সিকদার আমিনুল হক। এভাবেই দীপকের পরিচিতি আমাদের বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবিদের সারিতে। তার কবি পরিচিতিতে খুব একটা বেশি সময় লাগেনি।

ও. আ. : তিনি কবিতাকে ধ্যানজ্ঞান মনে করতেন, এসব নিয়ে আপনাদের মধ্যে কেমন ধরনের আলোচনা হতো?

পী. সা. : দীপকের এলিফ্যান্ট রোডের নিজস্ব বাড়ি এবং একসময় বেশ কিছুদিনের জন্যে ভাড়াটে ফ্ল্যাটের বৈঠকখানায় প্রায় প্রতিদিনই বিকেল ৬/৭টা থেকে রাত ১০টা অবধি জমে উঠত তৎকালীন কবি, সাহিত্যিক এবং সাংবাদিকদের আসর। গড়পড়তা ৬/৭ জন করে উপস্থিত হতো ঐ আসরে। এতে বন্ধু দীপক এবং পত্নী জলি গরম চা/কফি এবং মাঝে মাঝে ঝালমুড়ি, পেঁয়াজু ইত্যাদি দিয়ে আপ্যায়নে খুব আনন্দ পেত। বাল্যবন্ধু হিসেবে বেশিরভাগ সময়ই আমি উপস্থিত থাকতাম ঐ আসরে।

আমি যতদূর স্মরণ করতে পারছি, ওদের ঐ আসরগুলোতে কবিতা ও কবিদের বিভিন্ন প্রসঙ্গ উঠে আসত এবং মাঝেমধ্যে তুমুল আলোচনা এমনকি বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি হতো। আমার যদিও বাংলা কবিতা ও সাহিত্যের উপর জ্ঞান খুবই কম; কিন্তু বেশ কয়েকজন বন্ধু- দীপক, রফিক আজাদ, বেলাল আহমেদ- এঁরা চালচলনে ও কার্যকলাপে কবিতাকেই ধ্যানজ্ঞান মনে করে চলতেন। আমি বলব দীপক, কবি সিকদার আমিনুল হক পার্থিব সম্পদকে উপেক্ষা করে কবিতা লেখায় সমৃদ্ধি আনার জন্যে সবরকম বিলাসিতা ও আরাম আয়েশ উপেক্ষা করেছিল। দীপকের ধ্যানজ্ঞানে ছিল বাংলা কবিতার সমৃদ্ধির বিষয়।

ও. আ. : কবি পরিচিতি পাবার পর তার জীবনে কী কী পরিবর্তন দেখেন?

পী. সা. : কবি সিকদার আমিনুল হক ঘর থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও জনসাধারণের প্রতি নম্র, বিনয়ী এবং সহানুভূতিশীল আচরণ করত। শেষাবধি তার এই আচরণের কোন পরিবর্তন দেখা যায়নি। কবি পরিচিতি পাওয়ার পর অবশ্য আরও বেশি সময় নিয়োজিত করত কবিতা লেখায় ও প্রকাশনার পিছনে। তার প্রিয় অর্ধাঙ্গিনী মাসুদা আমিন জলিকে সাংসারিক কাজ এবং দুই ছেলের পড়াশোনা ও অন্যান্য বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে দেখেছি। তার কারণে কবি সিকদারের ওপার বাংলার বিশিষ্ট কবিদের সঙ্গে যোগাযোগ আরো বৃদ্ধি পেয়েছি। কবি দীপক আমাদের বাংলাদেশের তরুণ কবিদের খুবই উৎসাহিত করত এবং এতে করে তরুণরা কবি দীপকের সঙ্গলাভে খুবই খুশি হতো।

ও. আ. : সংসার ও কবিতাকে তিনি কীভাবে দেখতেন?

পী. সা. : বাংলাদেশের কবি পরিচিতির পূর্ণতায় পৌঁছে গিয়েও সাংসারিক জীবনের বিভিন্ন কাজে যোগ্য সহধর্মিণী মিসেস মাসুদা আমিন জলিকে সময় দিতে কুণ্ঠাবোধ করত না।

তাই দেখা যায় অনেক কবিদের মতো কবি দীপক সাংসারিক জীবনকে অন্য ধারায় দেখত না। সাংসারিক কাজে বেশি সময় না দিতে পারলেও তার দায়িত্ববোধ আমি ও আমরা উপলব্ধি করেছি বিভিন্ন বিষয়ে। কোনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় আমাদের সঙ্গে আলোচনা করত। যেমন দুটি ছেলের লেখাপড়া ও অন্যান্য ব্যাপারে উন্নতিকল্পে পথ খোঁজা এবং তার জন্যে আর্থিক সামর্থ্যরে সুযোগ বের করা ইত্যাদি।

ও. আ. : তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তার সম্পর্কে এমন কিছু কি জানেন যা অন্যেরা জানে না? সেগুলো জানতে চাই।

পী. সা. : ১৯৫২ থেকে ২০০৩ সালের ভেতর আমি অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে দেখেছি কবি সিকদার আমিনুল হক দীপকের বাংলা কবিতা লেখা ও সাহিত্যের উপর দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি যৌবনের উত্তাল স্রোত তাকে প্রেমিক কবিতে রূপন্তরিত করেছিল। তার প্রেম সংক্রান্ত এ জাতীয় ঘটনাবলি একমাত্র আমিই জানতাম প্রাথমিক পর্বে। তা সত্ত্বেও ওর বাংলা কবিতা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনায় কখনো ভাটা পড়তে দেখিনি। গতানুগতিক প্রেম সমস্যা কাটিয়ে উঠে স্ত্রী মাসুদা আমিনের অন্তরের অন্তস্তলের ভালোবাসায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দুটি পুত্র সন্তানের জন্মদান করে কবি সিকদার আমিনুল হক। এ ঘটনা তাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে কবি পরিচিতি এবং কবিতা গ্রন্থের প্রকাশনায়। সামাজিক পর্যায়ে সাংসারিক কাজ ও ধর্মের পালন- কবি সিকদার আমিনুল হক অতি সুন্দরভাবেই করে গেছেন।

ও. আ. : তার সম্পর্কে আপনি স্বাধীনভাবে কিছু বলুন।

পী. সা. : আমি দেখেছি যে, কবি সিকদার আমিনুল হক ওর ঘনিষ্ঠজনের উন্নতি দেখে খুব খুশি হতো এবং অন্যদের কাছে তা গৌরবের সাথে উপস্থাপন করত। বাল্যবন্ধু দীপকের কখনো কারো সাথে ঈর্ষাপরায়ণতা দেখিনি। ওর মানবিক আচরণের দ্বারা অন্যের প্রশংসায় ও খুবই আনন্দ পেত। হ্যাঁ, ওর যৌবনাবস্থায় এবং কবি পরিচিতি পাওয়ার পর কয়েকজন প্রেমিকাকে প্রকাশ্যে এবং অপ্রকাশ্যে প্রেম নিবেদন করতে দেখেছি। যদিও তারা ভালো করেই জানত যে কবি সিকদার বিবাহিত ও দুটি পুত্র সন্তানের পিতা। যাই হোক সেগুলো গতানুগতি ধারার স্রোতে ভেসে গিয়েছিল।

আরেকটি বিষয় দেখেছি, বেশি আর্থিক সচ্ছলতার জন্য ওর তেমন কোন উদ্যোগ ছিল না। অবশ্য এটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষি কবি ও সাহিত্যিকদের বেলায়ও হয়ে থাকে।

ও. আ. : কবি সিকদার আমিনুল হক এবং মানুষ সিকদার আমিনুল হক সম্পর্কে আলাদা করে বলুন।

পী. সা. : বন্ধু দীপকের পুরোপুরি কবি-পরিচিতির পর ওর কলমের শক্তি আরও বেড়ে গিয়েছিল। ওর কবিতার নকশা ও নির্মাণ কৌশলের ধারা অনেকের কাছেই প্রাথমিকভাবে একটু ধাক্কা খেত এবং যা বিশ্লেষণে সময় দিতে হতো। যাই হোক, বেশ কিছু কবিতার বই প্রকাশনার পর ওকে আমি আনন্দিত হতে দেখেছি। আমাকে নিয়ে আমাদের বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কবিদের ঘরে ওর নব্য প্রকাশিত কবিতার বই পৌঁছে দিত। অপেক্ষা করত জ্যেষ্ঠ কবিদের মন্তব্যের জন্যে। বিলম্বে হলে বা একেবারে কারো মন্তব্য না পেলেও কবি দীপক ওর কবিতা লেখার ধ্যানে মগ্ন থাকত।

সিকদার সর্বদাই তার মানবিকতার বিস্তারে সচেতন থাকত। ও মাঝে মাঝে বলত পীযূষ একটা সবল যুবক ও মধ্যবয়সী লোক কেন ভিক্ষা করতে আসে? ও সর্বদাই জনসাধারণের অহেতুক হাঙ্গামা ও ঝগড়াঝাটি থেকে দূরে থাকত। স্কুল জীবনে এর জন্যে যাকে ভীরু বলেছি বড় হয়ে তারই প্রশংসা করেছি। কবি সিকদারকে সেই মানবিকতায় মানুষ সিকদার হিসেবে পেয়েছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি যে দীপক কোন দিন অযাচিতভাবে কারো সমালোচনায় যেত না।

ও. আ. : তার সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাতের স্মৃতিচারণা করুন।

পী. সা. : বাল্যবন্ধু কবি সিকদার আমিনুল হক ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংককের বামরুংরাদ হাসপাতালে হার্টের চিকিৎসা শেষে আমার ছোট আস্তানায় এসেছিল। আমার নিজ হাতে বাঙালি মসল্লায় মাছ, মাংস, ডাল ও সবজি রান্না দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়েছিল। আমরা কিছুক্ষণ সময় কাটানোর পর ওকে হাসপাতাল সংলগ্ন হোটেলে পৌঁছে দিয়েছিলাম। তার ২/১ দিন পরেই ঢাকা ফিরে গিয়েছিল। নিয়তির ডাকে ১৭ মে ২০০৩-এ পরপারে চলে গেল। দীপক লিখে গেছে অনেক কবিতা। তার অনেক সৃষ্টি। সিকাদারের কাব্যগ্রন্থগুলো বাংলা কবিতায় নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। তার কবিতা দীর্ঘ দীর্ঘ দিন কবিতাপাঠকের পিপাসা মেটাবে বলে আমার বিশ্বাস।

  • আজ সিকদার আমিনুল হকের ৭৭তম জন্মদিন : শ্রদ্ধাঞ্জলি

    সিকদার আমিনুল হকের গদ্য রচনা

    ফারুক মাহমুদ

    newsimage

    সিকদার আমিনুল হক মূলত কবি। ‘বিপুলপ্রজ’ কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতিও রয়েছে। বেঁচে

  • আমার বাবা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবেন

    সালমান তারিক মিশা

    newsimage

    ছোটবেলা থেকে আমি খুব একা থাকতাম। স্কুলে ভর্তি হই ১৯৭৫ সালে গভর্নমেন্ট

  • মহাদেব সাহার কবিতা

    newsimage

    [মহাদেব সাহা ষাটের দশকের অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় একটি

  • নিরাপত্তা রক্ষী

    এম নাঈম

    newsimage

    লাশটি মাটির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আর গ্রামের মানুষরা চারিদিকে জটলা

  • অজানার ডাকে

    কণিকা রশীদ

    newsimage

    গত সতের দিন ধরে অন্ধ রজব আলী বসে আছে বকুল গাছের তলায়।

  • মহাস্থানের হাজার বছর

    সৌম্য সালেক

    newsimage

    নাটককে প্রাচীন কলাশাস্ত্রবিদগণ ‘দৃশ্যকাব্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। নাটকের মধ্যে বিশেষ কালপ্রবাহ আসতে

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    চতুর্দশপদী চিঠি মার্গারিটার কাছে ফাউস্ট মাহফুজ আল-হোসেন আমায় তুমি ক্ষমা কোরো না গ্রেচেন, আর করবেই