• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১

ফিরে যাব রাজপথে

সৌর শাইন

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর ২০১৯

image

মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি জীবননাশী দূতকে, যদিও চোখ দুটো বাঁধা। মৃত্যু আমার নিচের ঠোঁটটা আলতো ছুঁয়ে গেল। মখমলের মতো স্পর্শ। অনুভূতি সংজ্ঞাহীন! মোটেও ভয় লাগছে না। প্রচণ্ড রোমাঞ্চ হচ্ছে। ভয়ানক ও অন্তিম মুহূর্তের অপেক্ষা!

ওরা উনিশ জন, প্রায় সবার হাতে ধারালো দেশীয় অস্ত্র! সম্ভবত দুজনের হাতে পিস্তল। কারোর হাতে রাইফেলও। আমরা কাক্সিক্ষত শিকার রূপে বন্দি! আমাদের মৃত্যু ওদের আনন্দ দেবে নিশ্চিত। এ আনন্দ হবে নির্দয় ভাললাগার। তখন কেমন অনুভূতি হবে? ওদের মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোতে উত্তেজনার ঢেউ উঠবে, যা আনন্দ প্রকাশের পূর্বাংশ! অতঃপর পুঞ্জিভূত আনন্দ রূপান্তরিত হবে পিশাচের রূপে!

আমার পাশে জয়দেব, ওসমান আর সালেক। ওসমান ফুঁপিয়ে কাঁদছে। জয়দেব ধমকে বলল, মৃত্যুর আগেই তোর মরণ হয়েছে, তোর মরে লাভ নেই, যদি পারতাম তোকে আমি বাঁচিয়ে দিতাম। দুর্ভাগ্য, তোর মতো মরণভীতুর সাথে আমার মুত্যু হবে।

সালেক ভেজা গলায় বলল, প্লিজ, তোরা থাম। আমার খুব যন্ত্রণা হচ্ছে!

জয়দেব হেসে বলল, যন্ত্রণা তো আমারও হচ্ছে। চারজন চারটা রিভলবার পেলে সব ক’টাকে খতম করা কোনো ব্যাপারই ছিল না।

জয়দেবের কথা শুনে ঘূর্ণি প্রবলের মতো জেগে উঠলাম। নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। এক চিৎকারে উত্তেজিত স্বরে বললাম, হাতের বাঁধনটা খুলতে পারলে, ঐ শুয়োরগুলোকে কেটে কুটি কুটি করতাম।

চিৎকারের প্রতিধ্বনি দূর থেকে ফিরে আসতেই কারোর উপস্থিতি টের পেলাম। কিছু বোঝার আগে সজোরে কয়েকটা ঘুষি এসে পড়ল আমার চোয়ালে, নাক থেকে বেরুলো রক্ত। ঠোঁট বেয়ে রক্ত জিহ্বা স্পর্শ করল। লবণাক্ত স্বাদ! জয়দেব, ওসমান, সালেকের উপর ঘুষি ও লাথি পড়ছে। তিনজনই কাতরাচ্ছে! কিছুটা সময় পেরুবার পর কেউ আমার মাথার চুল টেনে ধরল। তপ্ত নিশ্বাসের সাথে বিশ্রী গলায় বলল, শুয়োর? এই গালিটা দিতে পারলি...কি তেজ রে তোর? হ্যাঁ রে... খুব হিম্মত দেখাচ্ছিস? বলি হবার আগে সব ছাগলই চিৎকার করে... হে হে হে! শালা...! তোদের প্রতিটা মাথা আমাদের অবস্থানকে জানান দেবে, রাষ্ট্র থেকে সারাবিশ্বে... হে হে হে! টিভি চ্যানেল, নিউজ পেপারের পাতা... বলবে কেউ জঙ্গি, কেউ বলবে বিচ্ছিন্নতাবাদী, সন্ত্রাসী, ডাকাত কেউ বিপ্লবীও সন্দেহ করতে পারে... হে হে হে! আর তুই বললি শুয়োর...

পরপর কয়েকটা ঘুষি মাথায় ও পেটে আঘাত হানল! পৃথিবীটা অন্ধকার হবার মুহূর্তে কুৎসিত হাসির প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম। কতটা সময় কেটেছে জানি না। বোধ ফিরে পাবার পর বুঝলাম সেই আগের জায়গায় মুখ থুবড়ে দাঁড়িয়ে আছি। দেবদারু গাছগুলোতে আমাদের বেঁধে রাখা হয়েছে। উপরে খোলা আকাশ, সামনে দিকটা মাঠ, পেছনে সারি সারি গাছ। এখন দিন না রাত বোঝা যাচ্ছে না। সূর্য তাপ যখন নেই তাই রাত ভেবে নিলাম। বন্দি চোখের কাছে পুরো সময়টাই অন্ধকার! ঘুটঘুটে অন্ধকার! বীভৎস! এ বীভৎসতা কি কালো রাতের? কিন্তু এখন রাত হলে তো নিশিপাখি কিংবা পোকাদের আওয়াজ শুনতে পেতাম। দিন-রাতের চিন্তা ত্যাগ করলাম। হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগলো, মৃত্যু দেখতে কেমন? প্রশ্নটি করব ভেবে ডাকলাম, সালেক... সালেক... সাড়া দে

গোঙানির শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পেলাম না।

চোখ খোলার ব্যর্থ চেষ্টা। প্রচণ্ড মাইগ্রেন পেইন। রশি বাঁধা হাতের কব্জিতেও ব্যথা। ক্ষুধায় শরীর অনবরত কাঁপছে! হঠাৎ দমকা বাতাস এসে চিবুক লেপ্টে ছুঁয়ে গেল। দুঃসহ মুহূর্তেও খানিকটা তৃপ্তি।

অনেকক্ষণ পরে ওসমানের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।

সালেক, আমি হাতের রশি খুলে ফলেছি।

সালেক গোঙাতে গোঙাতে বলল, বেশ করেছিস। এবার পালিয়ে যা।

চোখের বাঁধনও খুলে ফেলেছি। অন্ধকারে ওদের কাউকে তো দেখতে পাচ্ছি না।

ওদের দেখে তোর কাজ

নেই। যদি পারিস সবার রশি খুলে দে, নয় তো একাই পালিয়ে যা।

একা পালাতে যাব কেন? তোদের রশি এখনই খুলে দিচ্ছি।

জয়দেব বলল, আমার রশি খোলার প্রয়োজন নেই। হয় মরব নয় মারব। আমি তোর সাথে কাপুরুষের মতো পালাতে পারব না।

কান্না ভেজা কণ্ঠে ওসমান বলল, ঠিক আছে, তোর রশি খুলব না। তবে তোকে ছাড়া আমি কোথাও যাব না রে, বলে দিলাম কিন্তু। এটাই আমার শেষ কথা।

বুঝতে পারলাম ওসমান সালেকের রশি খুলছে। ওরা আমাদের হাত বেঁধেছে নাইলনের মোটা রশিতে। খোলাটাও ভয়াবহ কষ্টকর। তাও ওসমান নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছে। এবার আমাদেরও মুক্তি মিলবে। নিস্তব্ধতার ভেতর প্রায় মৃত্যু জয়ের উল্লাস। তবু বাতাসে কাঁচা পাতার বুনো গন্ধে এক অজানা ভয় মিশে আছে। নিশ্বাসের শব্দেও আশঙ্কার ¯্রােত। বুকের ভেতর ক্রমাগত ঢিব ঢিব আওয়াজ। হঠাৎ সচল মস্তিষ্কের আভাস পেয়ে ত্বক ইন্দ্রিয় সজাগ হলো। বুঝতে পারলাম আমার নগ্ন পা জোড়া এক ঝাঁক মশার দখলে। ওরা চুক চুক রক্ত চুষে খাচ্ছে। সুড়সুড়ে যন্ত্রণা! মৃত্যুর চেয়ে কম নয়। অসহ্য! পা নড়াচড়া করে তাড়াতে চাইলাম। মাতাল পতঙ্গগুলো উড়ে উড়ে আবার লোমকূপ খোঁজে ফেরে। ছিদ্রে ছিদ্রে সুচালো শুঁড় ঢুকিয়ে শুরু করে রক্ত পান। কয়েকবার তাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে ক্ষান্ত হলাম। ওরা কিছুতেই আমার পা ছাড়তে রাজি নয়। একটিবার মনে হলো মশারা ভারি বোকা, কিছুটা ধৈর্য্য ধারণ করলে কী এমন মন্দ হতো? একটু পর তো রক্তের বন্যা বইবে, তখন ইচ্ছেমতো আহার মেটাতে পারত। না, ঠিকই আছে ওরা, এই তো আমাদের পালানোর সুযোগ চলে আসছে। মশারা এখন যদি ক্ষুধা না মেটায়, কিছু সময় পর তো সুযোগ দূরে সরে যাবে আর থাকতে হবে অনাহারে।

আমার সাথে দাঁড়ানো দেবদারুকে একটিবার খুব অসহায় মনে হলো। গাছটা যদি পারত আমাদের হয়ে নিশ্চয়ই লড়ত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াই। হঠাৎ গাছটাতে বাতাসের ঝাপটা লাগল। সে তীব্রতা আমাকেও নাড়িয়ে দিলো। নাকে বাতাসবাহিত নেশা দ্রব্যের দুর্গন্ধ এসে লাগল। ওরা আশপাশেই আছে, বুঝতে পারছি স্পষ্ট। ওসমান বহু কষ্টে সালেকের হাতের রশি খুলতে সক্ষম হয়েছে। সালেক আমার কাছে ছুটে এল। প্রথমে আমার চোখের বাঁধনটা খুলল। তারপর হাতের রশিতে হাত লাগাল। চোখ মেলতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচা। শীতল হাওয়ার স্পর্শ! অন্ধকারের ভেতর দূরে মোলায়েম আলো দেখা যাচ্ছে। ওখানেই দুর্বৃত্তরা আড্ডায় মজে আছে। জয়দেবের হাতের রশি খোলার চেষ্টা করছে ওসমান। বড় শক্ত করে বাঁধা। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। জয়দেব ও আমার হাতের রশি খোলা সম্ভব হলো না। আমি বললাম, তোরা দু’জন পালিয়ে যা, আমাদের নিয়ে ভাবতে হবে না।

সে কী করে হয়? আমরা পালিয়ে যাব তোদের বিপদে রেখে? সালেকের উদ্বেগমাখা প্রশ্ন।

জয়দেব বলল, না পালালে মারা পড়বি। ওরা এদিকেই আসছে।

পূর্বদিকে তাকাতেই ওদের দেখতে পেলাম। টর্চের আলো। পায়ের শব্দ। কথোপকথনে নেশাগ্রস্ত গালাগাল ও হিং¯্র কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। হাতে হাতে অস্ত্র। পুরো পরিস্থিতি চোখের সামনে ঘোলাটে পর্দায় বিরাজমান।

জয়দেবের দিকে তাকিয়ে বললাম, এখান থেকে ইচ্ছে করলেই পালানো সম্ভব নয়। দক্ষিণ দিকে পুরো মাঠটাই কবরস্থান, ছোট ছোট গর্তে ভরা। ওদিকে যাওয়া সম্ভব নয়। আর বনের গভীরে যাওয়া মানে সেই একই বিপদে পড়া, ভেতরে নিশ্চয়ই ওদের আরো ঘাঁটি আছে। এ বন পুরোটাই ওদের দখলে।

জয়দেব নিশ্বাস ফেলল। বলল, সালেক ওসমান তোদের শেষবারের মতো বলছি, তোরা চলে যা।

আমিও বললাম, জয়দেব ঠিকই বলছে, তোরা যা। বাঁচা-মরা নিয়ে ভাবতে হবে না।

ওসমান বলল, তোদের রশিটা শেষ পর্যন্ত খুলতে পারলাম না।

বললাম, ওটার আর প্রয়োজন নেই।

কথাটা শেষ করতেই টর্চের আলো এসে চোখে পড়ল। সালেক ও ওসমান ছুটতে লাগল উত্তরে বনের দিকে।

মিনিট পাঁচেক পরে কয়েকটা গুলির আওয়াজ! যা আশা ছিল সবই মুছে গেল। মুহূর্তে মুচড়ে ওঠল বুকের ভেতরটা।

জয়দেব হেসে বলল, হা রে বিধাতা! এই তবে? এবার আমাদের পালা?

টর্চের আলোয় সব দেখা যাচ্ছে। আমার পা কেঁপে ওঠল। কিছুটা অবশও লাগছে। মশার কামড় ভুলে যাবার চেষ্টা করলাম। মাথার ডানপাশের শিরায় প্রচণ্ড ব্যথা ধরেছে। ওখানে দূষিত রক্তের জোয়ার। গলা শুকিয়ে পানির পিপাসা বেড়ে চলল। ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম।

পালাবার ফন্দি? হা রে তোদের তো সাহসের তারিফ করতে হয়। আমার ছেলেরা এতো কাঠ-খড় পুড়িয়ে তোদের তুলে এনেছে এভাবে লুকোচুরি খেলবার জন্যে? কুৎসিত চেহারার লোকটা দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল। পাশে দাঁড়ানো লম্বা লোকটা বলল, তোদের দুটো খতম। এখন তোরাও... যাবি আজরেলের কাছে...

কুৎসিত লোকটি আমার চুল টেনে ধরে পর পর কয়েকটা ঘুষি মারল। ব্যথায় চারপাশ ঘোলাটে। হা করেও চিৎকার দিতে পারলাম না, শেষ শক্তিটুকু কণ্ঠেই জমে রইল। শুনতে পেলাম, একটু পরেই খেলা শেষ, এতোটুকু অপেক্ষা করতে পারবি না?

জয়দেবের চিৎকার। বলে উঠল, এই কৌশিককে ছেড়ে দে, পারলে আমার সাথে লড়াই কর। একবার হাত খুলে দিয়ে দ্যাখ কী করতে পারি।

ভারি বুকের পাটা রে তোর! এই তোরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? ওই শালার মুখ ভোঁতা করে দে।

ওরা জয়দেবকে মারতে লাগল।

ওদের হাত থেকে রক্ষা পাবার আশা ছেড়েই দিয়েছি। এখুনি গুলি খেয়ে মরে যাব ভেবে সর্বোচ্চ উত্তেজিত হয়ে বললাম, কেন আমাদের তুলে এনেছিস? কী চাস তোরা? তোরা কারা? সালেক ওসমানকে মারলি কেন? তোদের কাউকে ছাড়ব না... বলে দিলাম... কাউকে ছাড়ব না...

কুৎসিত লোকটা চেঁচিয়ে বলল, থাম সালার পো... খুব গলা ঝাড়ছিস? কী করবি তোরা হ্যাঁ...? মিছিল-আন্দোলনের স্বাদ এখুনি মিটে যাবে রে... হা হা হা... সাধ যখন হয়েছে শোন মরার আগে সব জেনে নে... আমরা ভাড়াটে কুত্তা প্রজাতি রে... ছরকারি কি অপজিসন পার্টি সব্বাই আমাদের দুয়ারে আসে... অর্ডার হয়ে গেছে চারটে বেওয়ারিশ লাশ চাই... তোদের আন্দোলনের নিউজ করতে করতে মিডিয়া তিতে হয়ে গেছে... এখন থেকে নতুন নিউজ হবে... জঙ্গি কি ডাকাতের হাতে চার তরুণ খুন... হা হা হা... আর আমরা পাবো বাজেট রে... বাজ্জেট...

কারা তোদের পাঠিয়েছে বল? আমাদের মারার জন্য কে তোদের টাকা দিয়েছে? বল... জয়দেব সোজা হয়ে চিৎকার করে বলল।

দে চিৎকার দে রে বোকা হারামজাদা... জব্বর খারাপি বিহেভ করছিস, তারপরেও মরার আগে যত পারিস চালিয়ে যা... শোন... দুটো পার্টিই আমাদের দরোজায় এসে দাঁড়িয়েছে... দিয়েছে ব্ল্যাক মানি... সব্বাই খুন চায় খুন... তোদের আন্দোলন ঠেকা দেবার জন্যি সরকার চেয়েছে গুপ্তহত্যা... তারপর তোদের রক্ষার নামে নতুন অভিযানে নামবে পুলিছ... পুলিছের বাপ-দাদারা... আর এদিকে বিরোধী দল চায় এইসব আন্দোলন ওদের দিকে ঘুরে যাক... সেজন্য ওরাও চায় গুপ্তহত্যা... চায় লাশ... তোদের মেরে অপজিশন পার্টির লিফলেট পকেটে দিয়ে রাখার নির্দেশ এসেছে... পার্টির কর্মী মরেছে বলে সরকার খেদাবার জিগির তুলবে হরতাল ডাকবে... মাঠে নামবে... আমাদের আর কি... সবই খেলা... খেলব আর খেলাবো... আমাদের হাতে এক ঢিলে দুই পক্ষী মারার ফাঁদ... দেখলি তো... হা হা হা... বাজেট উদ্ধার তো কেটে পড়ব। নতুন কাজ হাতে নেবো... অন্যদিকে আমাদেরও তো আসল কিছু কাজ আছেরে...। আসলে কি তোদের নসিব বড় মন্দ... নয় তো আমাদের সামনে পড়লি ক্যানে? ডিসিশন তো ছিলো শহর থেকে না পেলে বাইরে থেকে এনে মার্ডার চলবে... তোদের পাওয়াতে ভালোই হলো... হে হে হে...

কুৎসিত হাসি শুনতে শুনতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। এবার লম্বা লোকটার কণ্ঠস্বর।

...ওই ডেডবডি দুটো এখানে নিয়ে আয়। কয়েকজন এক সাথে ছুটে গেল। ফিরে এলো সালেক ও ওসমানের লাশ নিয়ে। আমি বাকরুদ্ধ। জয়দেব আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল।

কুৎসিত লোকটা অন্যদের উদ্দেশ্যে বলল, চারটে মাথা কেটে ছবি পোস্ট করবি আমাদের ওয়েবসাইটে। ফরেন চ্যানেলগুলোতেও কানেকশন দিবি... আর লাশগুলো বনের শেষ প্রান্তে খালপাড়ে ফেলে আসবি রাত পোহাবার আগে। হা হা হা... টিভি চ্যানেলগুলো যেন আয়েশ করে নিউজ করতে পারে। লিফলেটগুলো সাথে থাকবে কিন্তু।

লোকটার রক্তাক্ত চোখ। পুরো মুখজুড়ে পিশাচের রূপ! বুঝতে পারছি মৃত্যু খুব সন্নিকটে। এদিকে ওরা জয়দেবকে নৃশংসভাবে মারছে। কপাল ফেটে রক্ত বেরুলো, বেয়ে বেয়ে নামল চোখে, মুখে, চিবুকে। জয়দেব বহুকষ্টে আমার নাম ধরে ডাকল, কুশু...

লম্বা লোকটা বলল, আরে বোকা... বলদা ঘোড়া এরে ডাকছিস ক্যানে? কুছু তো কিচ্ছু করতে পারবে না... এখন যাবি মরার বাড়ি... হে হে হে

জয়দেব শেষবারের মতো চিৎকার দিলো। সাহস থাকলে একবার ছেড়ে দেখ... তোদের বাপের নাম ভুলিয়ে দেবো...

কুৎসিত লোকটা বলল, এই ওরে ছেড়ে দে...

বস, এখনি ছেড়ে দেবো?

দে, ছেড়ে দে বললাম তো। ভাল করে ছেড়ে দে...

দেহ থেকে জয়দেবের মাথাটা ছিঁটকে পড়ল দূরে। আমার পা জোড়া ভিজে গেল তীর বেগে আসা গরম রক্তে। দীর্ঘসময়ের একটা যন্ত্রণা থেমে গেল। রক্ত খেকো মশাগুলো উধাও। বুকে তীব্র চাপ অনুভব করলাম। পেটের ভেতর মোচড় দিলো। আর সাথে সাথে সেই দুপুরে পেটে যা পড়ে ছিলো সব গলা বেয়ে উপচে নেমে এলো। অর্ধেক হজম হওয়া ছোলা মুড়ির অপভ্রংশ। চোখ বন্ধ। অস্পষ্ট স্বরে বললাম, পানি... পানি

ওরা কেউ বলল, এই আদমি পানি গিলবে ওরে পানি দে রে... হে হে হে

পৈশাচিক হাসির শব্দ।

কিছুক্ষণ পর। কেউ মুখের কাছে গ্লাস ঠেঁকিয়ে বলল, নে পানি খা রে, জেবনের শেষ পানি নে।

মদের গন্ধ। মুখে নিতে চাইনি, জোর করে ঢেলে দিলো। জিহ্বা পেরিয়ে গলা ভিজল। চরম অস্বস্তি! তীব্র লবণাক্ত স্বাদ। তামাটে গন্ধ! ওরা আমার দিকে টর্চের আলো ফেলে চিৎকার করে হাসছে। গলার ভেতর চলে যাওয়া তরলটুকু আর ফিরে এলো না, মুখ থেকে বাকিটুকু উগড়ে ফেলে দিলাম। বিস্ফারিত চোখে তাকালাম। যা কখনো ভাবতে পারাটাও সম্ভব নয়, তাই পান করেছি।

লম্বা লোকটা হেসে বলল, কেমন পানি গিলেছিস? জন্মের মতো স্বাদ মিটেছে, না আরো কয়েক গেলাস দেবো। তোর আরো দু’দোস্ত জবাই করা বাকি আছে রে... ওদের রক্তও তোকে গিলতে হবে!

আমার মুখ বেয়ে রক্ত পড়ছে। এ রক্ত জয়দেবের! এ আমি কী করেছি? আমাকে কোন পাপের শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে?

জয়দেবের কাটা দেহের পাশে ওসমান ও সালেকের লাশ। ওসমানের গুলি লেগেছে মাথার পেছন দিকে আর সালেকের পিঠের দিকে। রক্তে ওর শার্ট ভিজে আছে, দূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে। আমি স্থির দাঁড়িয়ে, নিজের মৃত্যুভয় প্রায় ভুলতে বসেছি। পাশের দেবদারু গাছটা আবার নড়ে উঠল, আচমকা বাতাসে।

কুৎসিত জানোয়ারটা ইশারা দিতেই সালেক ও ওসমানের মাথা কেটে ফেলা হলো। আমি পৃথিবীর সব ভুলতে বসেছি। বুঝতে পারছি এবার আমার সময় হয়ে এসেছে। তিনটি কাটা মুণ্ড পাশাপাশি রাখা। আরও একটি যোগ হবে, আমার চোখ-মুখ হঠাৎ জ্বলে উঠল।

লম্বা লোকটা বলে উঠল, এবার রক্তখোর শালাকে এদিকে নিয়ে আয়। পেয়ারে দোস্তের রক্তে জিব ডুবিয়েছিস, একি চাট্টিখানি কথা রে...

ওরা ছুরি দিয়ে আমার হাতের রশি কেটে দিলো। সামনের দিকে এগোতে পারলাম না। পা নড়ছে না। ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। তীব্র হাসির শব্দ ভেসে এলো।

কুৎসিত লোকটা বলল, ওটাকে এখন জবাই করার দরকার নেই, সারারাত হাসি-তামাশা করা যাবে। তারপর... ভোর রাতে হবে বলী...

পাশের সবাই সায় দিলো।

ঠিকহে বস। বলল লম্বা বদমাশটা।

যা, তোর হায়াত বেড়ে গেলো রে। চল তোকে নিয়ে একটি মজার খেলা শুরু করি। ওধারে কিছু দেখতে পাচ্ছিস?

না, কিছু দেখতে পাচ্ছি না। আমি বললাম।

হা হা হা... আন্ধারে রাতকানা আদমি। শোন, ওই দখিনধারে ওগুলা কব্বর, পরজগতের বাড়িঘর, ইখান থেকে চার কিলো দুনিয়া, কব্বরের বাসিন্দাদের দখলে। হা হা হা... তোর চোখ হাত বেঁধে ছেড়ে দেবো, কব্বরের পাড় ধরে হাঁটবি... আর হাঁটবি... যতক্ষণ হাঁটতে পারবি... ততক্ষণ বাঁচবি... আর কব্বরে পড়বি তো সোজা গুলি... বুঝলি খেলার নিয়মকানুন? এইভাবে চলবে সুবে সাদিক ফজরের আজান পর্যন্ত, তারপরও বেঁচে থাকবি তো গুলি নয়, সোজাসাপটা ছুরি চলবে... মুণ্ড কাটাকাটি...! কী হে বুঝলি?

হুঁ... বললাম।

এই তবে শুরু করে দে। ওর হাত-চোখ বেঁধে পথ বাতলে দে।

ওরা আবার আমার হাত পেছনে নিয়ে বাঁধল। আমি জয়দেবের মুখের দিকে তাকালাম। ও হাসছে। ওসমান উপুড় হয়ে এক চোখ মেলে তাকিয়ে। সালেকের চোখ বন্ধ। মাথা থেকে দেহগুলো অনেকটা দূরে। চোখ বাঁধার সাথে সাথে অন্ধকার নেমে এলো।

যা, হেঁটে যা...। আমি তোর পিছু ট্রিগারে আঙুল চেপে অপেক্ষায় আছি রে।

অবশ পা জোড়া চলতে চায় না। তবু পা তোলার চেষ্টা করছি। অলক্ষ্যে শুনতে পেলাম জয়দেব বলছে, যা কুশু, থেমে থাকিস নে।

আমার পা নড়ে উঠল। এগোতে লাগলাম এক পা দু’পা। দেবদারু গাছটাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি। দণ্ডায়মান রেখে যাচ্ছি মৃত্যুকে। যার সাথে ভবিষ্যতে নিশ্চিত দেখা হবে। ঝাঁকে ঝাঁকে মশাগুলোর কথা মনে পড়ল। ওরা আমার রক্ত খেতে খেতে জয়দেবের রক্ত লেপ্টে আত্মাহুতি দিয়েছে। ওরা কি আর ফিরে আসবে না?

না, ওরা আসবে না।

কে কথা বলছ? কোনো সাড়া নেই কেন?

আমি দেবদারু, তুমি এগিয়ে যাও...। সামনে একটা আমগাছ আছে, ওর ডান পাশ দিয়ে এগিয়ে যেও। তারপরই কবরস্থান শুরু।

আমগাছটাকে ডানে রেখে করবের দিকে প্রবেশ করলাম। পেছনে বুলেটের ভয়, মৃত্যু আরেকটিবার মাথার ভেতর কামড় দিলো।

তুই আমার সাথে আয়, কোনো ভয় নেই।

ওসমান তুই?

হ্যাঁ, চল... চুপচাপ... ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে দে, সাবধান কবরের পাড় অনেকটা ভঙ্গুর। এভাবেই সোজা যেতে থাক। সামনে আপাতত পড়ে যাবার মতো ভাঙা কবর নেই রে।

ওসমানের দেখানো পথে এগোতে লাগলাম। বার বার মৃত্যুকে মনে পড়ছিলো। হঠাৎ জয়দেব ধমকে বলল, মৃত্যুকে মনে করার ইচ্ছে হলে, এখুনি মরে যা। আবারো তোকে বলছি, তোর মৃত্যু এখন আমার হাতে বন্দি। ভয় ভুলে যা, হাঁটতে থাক কুশু।

এগিয়ে যাচ্ছি অজানা অন্ধকারে। কান সজাগ করতেই শুনতে পেলাম সালেক চাপা স্বরে বলছে, বামে যা... বামে যা... ওদিকটা মজবুত আছে।

ঠিক বামে ঘুরে হাঁটতে লাগলাম। অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছি।

থেমে যাসনে দোস্ত, পেছনে রিভলবার তাক করা।

প্রায় পড়ে যাচ্ছিলাম, জয়দেব আমাকে খপ করে চেপে ধরল।

সোজা হয়ে দাঁড়া কুশু। আমরা তো আছি তোর সাথে।

আচ্ছা একটা প্রশ্ন করব?

এ সময় আবার কিসের প্রশ্ন?

তোরা কি বেঁচে আছিস?

আমরা বেঁচে থাকার ওপারে বেঁচে আছি। এখন তোকে বাঁচতে হবে।

ওসমান বলল, আমার হাত ধরে, এগিয়ে চল।

কীভাবে হাত ধরব? আমার হাত যে পেছনে বাঁধা।

থাক, হাত ধরতে হবে না। শোন, পূর্ব দিকে পথ ধর। ওপাশে পুরো এরিয়া নতুন কবর। তোর পথ চলতে অসুবিধে হবে না।

চলতে লাগলাম, নতুন পুরাতন কবরের বুকে পা ফেলে। মানুষের বুক চিরে আমার পায়ের দাগ পড়ছে মাটিতে। তৈরি হচ্ছে ক্ষত আর ক্ষত চিহ্ন। এর চেয়ে মৃত্যু কি ভাল নয়?

না, ভাল নয়। জয়দেব বলল।

অনেক হেঁটে যখন আমি ক্লান্ত, তখন সালেক বলল, এই তো আরেকটু সামনেই প্রাচীর ওটা টপকালে তোকে ওরা আর খুঁজে পাবে না। ধীরে ধীরে এগিয়ে যা।

প্রাচীর টপকাব কেমন করে?

ওসমান বলল, প্রাচীর টপকাতে হবে না, এখানে গেট আছে। ওপাশে গিয়েই গেট আটকে দিবি।

প্রাচীরের কাছে আসতেই জয়দেব আমাকে জড়িয়ে ধরল।

কুশু, তুই ফিরে যা, আমরাও ফিরব, আবার নতুন করে। দেখা হবে, রাজপথে মিছিলে ন্যায্য দাবির আন্দোলনে...

ঠিক ঠিকই প্রাচীরের পাশে একটি গেট পেলাম। ওসমান বলল, তোর তো হাত বাঁধা, মুখে দাঁত দিয়ে ছিটকিনিটা খুঁলে ফেল। যত কষ্টই হোক না কেন... এটা তোকে খুলতেই হবে...

অনেকক্ষণ চেষ্টার পর গেট খুলে গেল। ওপ্রান্তে গিয়ে ঠিক একইভাবে দাঁতের জোরে গেট আটকে দিলাম। ওপাশ থেকে চিৎকার ভেসে এল। শালা পালাচ্ছে... গুলি কর... গুলি কর।

ওদের চিৎকার শুনে মৃদু হাসলাম, এগোতেই একটি গাছের সাথে ধাক্কা লাগল। মাথা ও কপাল ঘষে চোখের বাঁধনটা কিছুটা এদিক সেদিক করতে পারলাম।

চোখে ভেসে এল পূর্বাকাশের আলো।

ডাকলাম, জয়দেব... সালেক... ওসমান কোথায় তোরা?

এবার ওরা কেউ সাড়া দিলো না।

একটা দুঃস্বপ্ন থেকে সজাগ হলাম। না, আর হোস্টেলে ফিরে যাব না।

কোথায় যাব? একটাই পথ খোলা আছে... রাজপথে...

  • সিলভিয়া প্লাথ

    মৃত্যু, নৈঃসঙ্গ্য ও আত্মবিনাশের কবি

    কামরুল ইসলাম

    newsimage

    সিলভিয়া প্লাথ ছিলেন আমেরিকান কনফেশনাল কবিদের অন্যতম। সাহিত্যে কনফেশন বলতে বোঝায় সেই আত্মজীবনীমূলক রচনা (প্রকৃত

  • জীবন প্রলয়ী সিলভিয়া প্লাথ

    মিলটন রহমান

    newsimage

    আমার অন্তর্গত অনুসন্ধান এবং পর্যবেক্ষণিক সিলভিয়া প্লাথের বয়স বাইশ বছরের কম নয়। প্রথমদিকে কাব্যের চেয়েও বেশি অনুরক্ত এবং

  • সিলভিয়া প্লাথের কবিতা

    অনুবাদ : অশোক কর

    দু’জন, নিঃসন্দেহে ওরা দু’জনই। এখন খুবই স্বাভাবিক বলেই মনে হয়Ñ একজন

  • কমলকুমার বিষয়ে ভাব প্রকাশ

    মামুন হুসাইন

    newsimage

    কৃতি সমালোচকের বাক্য নকল করে বলি- লেখা তার ঈশ্বর সাধনা; নাকি বলবো পুরাণ, ব্রতকথা, ধ্রুপদী সঙ্গীত, মন্দির ভাস্কর্যের

  • উত্তাপ

    ফরিদা ইয়াসমিন সুমি

    newsimage

    ঘুম ভেঙে যায় বিথীর। দরদর করে ঘামছে। মনে হচ্ছে সারারাত ধরে স্বপ্ন দেখছিল। এরকমটা হয় মাঝেমাঝে। স্বপ্নের কথা মনে করে ভীষণ লজ্জা

  • সাময়িকী কবিতা

    নোরা টোরভাল্ডের প্রাণ বাঁচিয়েছে। মিস লিন্ডে মৃত্যুশয্যাশায়ী মার পাশে ছিল, তার