• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৭ কার্তিক ১৪২৬, ১৪ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

ফানুস

সুরাইয়া জাহান

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

image

‘ফতু! এই বেলা কৈথুনে আইলি?’ পানের ছিবড়া মুখ থেকে মুঠোয় নিয়ে নোনা ওঠা দেয়ালের দিকে ছুড়ে মারে আনোয়ারা বেগম। পায়াভাঙ্গা চৌকির উপর কোনরকমে আলগা হয়ে বসে ফাতেমা ওরফে ফতু।

‘বাসার থনে আইলাম মামী! আপনেরা বেকে বালা আছেননি?’ দেড় বছরের ছেলেটাকে কোলের মধ্যে ঠিকঠাক করে বসায় ফতু।

‘আমার আর থাহন! বেবাক শৈল্যে বিষ, বেদনা।’ সোজা করে মেলে রাখা পা দু’খানি দু’হাতে টিপতে থাকে আনোয়ারা। ফতুর কথায় ঘুমিয়ে থাকা বিষ, বেদনা যেন চাগিয়ে উঠেছে তার।

জরির পাড়, সবুজ জমিনের একটা টাঙ্গাইল শাড়ি পরেছে ফতু। আলগোছে মাথার উপর আঁচল তুলে দিয়েছে। দেখতে গায়ের রং আগেও কালো ছিলো। তবে এখন আর তেমন কালো লাগে না ফতুকে। স্বচ্ছলতা খুব না থাকলেও চেহারায় মলিন ভাব নেই। খেয়ে পরে বেশ চলে যাচ্ছে জীবন। ওকে দেখে আনোয়ারা বেগমের মনটা যেন তিক্ততায় ভরে ওঠে। তার বয়স পয়তাল্লিশের কাছাকাছি। গায়ের রং কালো, স্বাস্থ্য থলথলে। আগে থেকেই কাজকর্ম কমই করেন। একসময় ঘরের সব কাজ ফতুই সামলাতো। এখন ছেলের বৌ সামলায়। বসে বসে পান খাওয়া আর বকবক করাই তার প্রধান কাজ।

তক্তপোষের চাদরখানায় গাঢ় ময়লার আস্তরণে ঢেকে গেছে ছাপার রং। সেই চাদরে তর্জনীর অবশিষ্ট চুন মুছতে মুছতে ছেলের বউ সুরমাকে ডাকেন আনোয়ারা-

‘বউ, ও বউ , ফতু আইছে। অরে কিছু খাইবার দেও।’ ফতুর কোলের বাচ্চাটাকে নেয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন আনোয়ারা। বাচ্চাটা মাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে।

‘নাতির বয়স কত হইলরে ফতু? ঠিক মতন খাওন দেস না? শরীল পুরে না কেলা?’

‘নানির কোলে যা রাজু’ বলতে বলতে আনোয়ারার দিকে ছেলেকে ঠেলে দিতে চাইলে জোরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে রাজু।

‘থাউক, থাউক। হেয় আবার কান্দন জুরছে। তোর কোলেই থাউক।’ আবারও এলুমনিয়ামের পানের কৌটা কাছে টেনে পান বানাতে লেগে যায় আনোয়ারা।

লালবাগ গোর-এ শহিদ মাজারের থেকে রহমতউল্লাহ স্কুলের দিকে যেতে বামপাশের গলিতে আনোয়ারা বেগমের ডেরা। চন্দ্র, সূর্যের মুখ দেখার জো নেই ঘরের দরজা জানালা দিয়ে। দুই কাঠার উপর জমিনে মালিকের ব্রিটিশ আমলের মোটা দেয়ালের তিনটা ঘর। সামনে যেটুকুন খোলা জায়গা ছিলো সেটুকুন জায়গায় শরিকদাররা টিন দিয়ে ছাপড়া বানিয়ে ভাড়া দেয়। একেক রুমে একটা করে পরিবার থাকে। আনোয়ারা একরুম নিয়ে সাথে বারান্দার মতন জায়গাটুকুতে পলিথিন লাগিয়ে ছেলের জন্য চৌকি পেতে দিয়েছে। বাড়ির আট পরিবার এক রান্নাঘর আর এক টয়লেট ব্যবহার করে। বাপ মা মরা ফতুও একসময় তার কাছেই থাকতো।

দিনের বেলায়ও সারাক্ষণ আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয় ঘরের ভেতর। অনুজ্জ্বল আলোয় ঘরের ভেতর চোখ বুলায় ফতু। ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। এমন সময় দরজায় কড়মড় শব্দ তুলে বারান্দার অংশ থেকে বেরিয়ে আসে বশির, আনোয়ারার একমাত্র ছেলে। ফতুকে দেখে বিব্রত ভঙ্গিতে খানিক দাঁড়ায়-

‘কহন আইলি? কেমন আছস?’ ডান হাতে বেশ ভারি একটা ব্যাগ। ব্যাগটা বাম হাতে নিয়ে আবার নড়েচড়ে দাঁড়ায় বশির।

‘বালা আছি। তুমি কেমন আছো বশির ভাই?’ রাজুকে কোলে নিয়ে দাঁড়ায় ফতু।

‘বয়। আমি যাই কামে। রাইতে ভাত খায়া জাইস।’ বেরিয়ে যায় বশির। সেই দিকে তাকিয়ে থাকে ফতু।

ছয় বছর বয়সে মাকে হারিয়ে যখন বাবা আসমত আলীকে আঁকড়ে ধরে বাচঁতে চেয়েছে ফতু- বিয়ে করে নতুন মা এনে ঘরে তোলে আসমত। ছয় মাস পরে সাপের কামড়ে বাপ মারা গেলে মামা রহিমুদ্দির সাথে এই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায় ফতু। ওকে দেখে চিৎকার-চেঁচামেচি জুড়ে দেয় আনোয়ারা- ‘নিজের পোলাপাইন লইয়া থাহনের জায়গা নাই, হেয় আরেকজন লইয়া আইছে’। ঘরের হাঁড়ি পাতিল রহিমুদ্দির দিকে ছুঁড়ে মারে আনোয়ারা। শেষমেশ স্ত্রীকে বোঝালো রহিমুদ্দী- ‘ঘরের বেবাক কাম ওরে দিয়া করাইতে পারবা। সাত চড়ে রা করবো না এমুন একখান মাইয়া ফতু।’ শেষমেশ কী বুঝলো আনোয়ারা- সেই জানে! মামীর ঘরে ঠাঁই হলো ফতুর। বিনিময়ে সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। মামী, তার তিন মেয়ে আর এক ছেলের লাথি, কিল থাপ্পড় রইলো উপরি পাওনা। এতো অনাদর আর অযত্নেও শক্তপোক্ত শারীরিক গঠনের নজরকাড়া সৌন্দর্য পেলো মেয়েটা। পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজনের ফিসফিসানি, গুঞ্জনে ফতুও দু’চোখের পাতায় স্বপ্ন আঁকে বশিরকে নিয়ে। বয়স তখন চৌদ্দ কি পনের। বশির বিশ একুশের তরতাজা যুবক। সুযোগ পেলেই আড়ালে আবডালে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ফতুর তন্বী দেহলতা। বিড়ি খাওয়া কালচে ঠোঁট দুটো চেপে ধরে ফতুর শুষ্ক ঠোঁটে। সেইসব দিনের কথা ভেবে বুকের মধ্যে তোলপাড় করে ফতুর।

পিরিচে কয়েক টুকরা বেঙ্গল বিস্কুট নিয়ে আসে সুরমা। মনের অন্ধকারে ফর্সা মুখখানাও কালো লাগছে। ফতুকে দু’চোখে দেখতে পারে না মেয়েটা। কখনো ভালো করে দু’টো কথাও বলে না। তাতে অবশ্য ফতুর কিচ্ছু যায় আসে না। নির্লিপ্ত মুখে সেও তাকিয়ে থাকে সুরমার দিকে। বিয়ের চার বছরে শরীর স্বাস্থ্য আরো তাগড়া হয়েছে। ফতুকে পরাজিত করে এই বাড়ির বউ হতে পারায় এক ধরনের দেমাগ ছিলো তার চোখেমুখে। কেন যেন দেমাগের সেই জ্বলজ্বলে ভাবটা উধাও সুরমার চোখমুখ থেকে।

‘ল বিস্কুট ল। তোর পোলাডারে দে’ ফতুকে বিস্কুট নিতে বলে আনোয়ারা। বিস্কুট দেখে ফতুর ছেলে হাত বাড়িয়ে দেয় পিরিচের দিকে। রাজুর হাতে একটা বিস্কুট দিয়ে আগের মতই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে থাকে ফতু।

‘জামাই ঠিকঠাক মতন কাম করেনি? কামাইরুজি কেমন?’ মুখে আধেক পান পুরে দিয়ে চিবুতে থাকে আনোয়ারা।

‘হ মামী করে। আল্লায় দিলে বালাই কামাই রুজি’

আনোয়ারার বাবার দিকের আত্মীয় সুরমার বাবা। কেরানীগঞ্জের দেড় কাঠা জমির লোভ দেখিয়ে মেয়ে সুরমাকে বউ করার প্রস্তাব দেয় আনোয়ারার কাছে। মেয়েদের তড়িঘড়ি বিয়ে দিয়ে আনোয়ারা উঠেপড়ে লাগে ছেলের বিয়ের জন্য। বাদ সাধে রহিমুদ্দি-

‘বাপ মা মরা মাইয়াডারে বউ কইরা রাখলে কি এমন ক্ষতি অইবো? ঘরের মাইয়া ঘরেই থাকবো’ মিনমিনে গলায় নিজের মতামত জানায় সে।

‘হ কাম পাই না আর কি! কামের মাইয়া বিয়া করামু আমার পোলারে? অয় আমার বান্দি। বউ আনুম লগে জমিও আনুম। এক ঢিলে দুই পাখি...’ আড়ালে থেকে মামীর সব কথাই শুনতে পায় ফতু। কেমন করে যেন একটা বিয়ের প্রস্তাবও আসে ওর জন্য। বাপ-মা মরা আকবর বহুতল ভবনে দারোয়ানের কাজ করে। ওর দূরসম্পর্কের এক চাচা প্রস্তাব দেয় রহিমুদ্দির কাছে। দুই চারজন মানুষ নিয়ে এসে আকবর বিয়ে করে বউ নিয়ে তোলে বকশি বাজারের এক রুমের বাসায়।

ছোট রুমটায় প্রথম যখন আসে ফতু- একটা চৌকি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। নেহাত চোখের লজ্জায় একটা তোষক, দুটো বালিশ, একটা মশারি আর বিছানার চাদর কিনে দিয়েছিলো ফতুর মামী। আর দেবেইবা কোথা থেকে? রহিমুদ্দির ভাঙ্গারির ব্যবসায় এতগুলো পেট চালানোই মুশকিল। তার মধ্যে বশির তখন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে এদিক সেদিক ঘোরে আর ফতুর সাথে প্রেম করে। তারপরও রহিমুদ্দি স্ত্রীকে ফাঁকি দিয়ে ভাগ্নি জামাইকে পাজামা-পাঞ্জাবি কিনে দেয়। আকবর দুটো টাঙ্গাইল শাড়ি, পেটিকোট, ব্লাউজ কিনে পলিথিনে নিয়ে বিয়ে করতে যায়। একটা শাড়ি ছিলো টুকটুকে লাল। সেই শাড়িটা পরেই আকবরের ঘরে আসে ফতু। তখন অল্প অল্প শীত ঢাকার বাতাসে। চৌকিতে বসে অঝরে কাঁদছিলো সে। আকবরের দুজন বন্ধু এসেছিলো সাথে। তারা বিদায় হতেই আকবর এসে ফতুর পাশে বসে। শরীর ছমছম করে ফতুর। কিছুক্ষণ উসখুস করে আকবরই কথা বলে-

‘তোমার খিদা লাগছে? ঘরে তো কোন খাওন নাই। যাই কিছু লইয়া আহি’- চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই আকবরের ডান হাত খাঁমচে ধরে ফতু-

‘আমার ডর করে। আমনে যাইয়েন না’ বলেই আরো জোরে কেঁদে ওঠে।

‘ডর কিয়ের! আমি আছি না?’ ফতুর পাশে বসে পড়ে একহাতে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে আকবর। ভুলেই যায় দুজনেই দুজনার কাছে নতুন।

‘এই মোড়ের থেইক্যা কিছু লইয়া আহি। এতক্ষণ তুমি দরজা লাগায়া বইয়া থাহ।’

আকবর চলে গেলে ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে বসে থাকে ফতু। মাথা ঘুরিয়ে চারদিকটা ভালো করে দেখে নেয়। চৌকির কোনায় মামার দেয়া তোষক-বালিশের গাট্টিটা কাছে টেনে নেয়। শাড়ির আঁচল কোমরে পেঁচিয়ে গাট্টি খুলে ফেলে। আগের পাতলা তোষকের উপর নতুন তোষক, চাদর বিছিয়ে দিয়ে পরিপাটি বিছানা করে। বালিশে কভার লাগায়। ঘরের এক কোণে ছোট একটি টুলে পানির বোতল আর গ্লাস রাখা। ঢকঢক করে একগ্লাস পানি খায়। এর মধ্যেই দুই প্যাকেট মোরগ পোলাউ নিয়ে ফেরে আকবর। ওকে দেখে মাথার ঘোমটা টানে ফতু।

‘তুমি তো বেবাক গুছায়া রাখছো। আইয়ো আমরা বিছনায় বয়া খাই’

বলতে বলতে তোষকের নিচ থেকে একটা পেপার নিয়ে বিছানার উপর বিছিয়ে দেয় আকবর। তার উপর রেখে প্যাকেট খোলে-

‘আমার তো রান্ধন বাড়নের মানুষ নাই, হের লাইগ্যা আইজ কিন্না খাওয়াতাছি। কাইল তোমারে লইয়া হাঁড়ি পাতিল কিনুম। আইজকা কষ্ট করো...’ ফতুর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে আকবর। সেই হাসিতে ফতু যেন খুঁজে পায় বিশ্বাস আর নির্ভরতা। টপটপ করে কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে ওর গাল বেয়ে।

বিপত্তি লাগে ঘুমাতে যাওয়ার সময়। আকবরের আগের সিঙ্গেল একটা কম্বল। এখন তারা দুজন মানুষ। কোন মতেই একটা কম্বলে দুজনের হয় না। শেষে আকবর বুকের কাছে টেনে নেয় ফতুকে।

‘দুইজনে গায়ে গায়ে লাইগা থাকলে দেখবা এক কম্বলেই হইবো হেঃ হেঃ হেঃ’। ফতুও মাথাটা গুঁজে দেয় আকবরের উষ্ণ বুকে।

শুরু হয় ফতুর সংসার। মানুষটা ফতুকে আগলে রাখে, যতœ করে। এর মাস দুয়েক পরেই বিয়ে করে বশির। ঘরে বউ রেখেও কতবার যে ফতুকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছে বশির- আজ তার কোন হিসেব নেই ফতুর কাছে।

প্রথম প্রথম ঘরের কাজ করেই সময় কাটে ফতুর। খুব সকালেই খেয়ে ডিউটিতে চলে যায় আকবর। রান্না, ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া- দিনের সব কাজ শেষে অখ- অবসর। শেষে নিজেই বুদ্ধি করে কাজের কথা বলে আকবরকে। প্রথমে রাজি হয় না। যখন ফতু বুঝিয়ে বলে পাশের গলিতেই একটা টুপির কারখানায় সুতা কাটার কাজ করবে, রাজি হয় আকবর। নিজে গিয়ে দেখে বেশ ভালো পরিবেশ কারখানার। বাড়তি আয়ের সুযোগ হয় ফতুর। শুরুতে সপ্তাহে এক হাজার করে টাকা পায়। পরে বারশো করে সাপ্তাহিক আয় যোগ হতে থাকে আকবরের বেতনের সাথে। সেই টাকায় ফতু ঘরের নানান টুকিটাকি জিনিস কেনে। কারখানার একটা মেয়েকে নিয়ে আজিমপুর কবরস্থানের সামনে থেকে ছোট একটা ওয়ারড্রোব কিনে আনে। জিনিসটা দেখে ভীষণ খুশি হয় আকবর। যখন নাইট ডিউটি করতে হয় আকবরকে তখনই একা একা ভয় পেতো ফতু। কারণটা অবশ্য কোনদিনই বলেনি আকবরকে। এক রাতে আকবর ডিউটি করতে গেলে কিছুক্ষণ পরেই দরজায় আবার কড়া নাড়ে কেউ একজন। দরজা খুলতেই বশির হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দেয়। তারপর ফতুকে জড়িয়ে ধরে।

‘তোরে ছাড়া আমি বাচুম না। আমার লগে আইজকেই ল তুই। আমরা বিয়া করুম’ পাগলের মতন ফতুর চোখেমুখে চুমো দিতে লাগে বশির।

নিজেকে যতই ছাড়িয়ে নিতে চায় মেয়েটা ততই আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বশির। শাড়ি ধরে টেনেহিঁচড়ে খুলতে চায়। বশিরের কান্ড কারখানায় ভীষণ ভয় পেলেও ফতু বুদ্ধি হারায় না। বুঝতে পারে চিৎকার করলে এই ঘটনা জানাজানি হয়ে আকবরের কানেও যাবে। তাতে করে আকবর সবসময় ফতুকে সন্দেহের চোখে দেখবে। ঠান্ডা মাথায় ফতু বশিরকে বলে-

‘তুমি এহনি বাইর হইয়া না গেলে আমি চিৎকার দিয়া মহল্লার মানুষ ডাকুম। হ্যারা তোমারে থানায় দিবো। আর একখান কতা- আকবররে ছাইড়া কোনহানে যামু না আমি।’

মাথা নিচু করে চলে যায় বশির। কোন কাজই ঠিকমতন গুছিয়ে উঠতে পারে না। ওদিকে ফতুকে একা রেখে রাতে ডিউটি করতে পারে না তাই দারোয়ানের চাকরি ছেড়ে দেয় আকবর। পাড়ার মোড়ে ছোট একটা মুদির দোকান দেয় ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে। সকাল থেকে দোকানে বসে আর দুপুরের পরে রিকশা চালায়। সেই সময় ছেলে কোলে নিয়ে ফতু দোকান সামলায়।

‘বশির ভাইয়ের কামাই রুজি বালানি মামী? হুনলাম দোকান ছাইরা বলে কি সব বনাজি ঔষদের কারবার করে?’ ছেলের মুখে লেগে থাকা বিস্কুটের অবশিষ্টাংশ শাড়ির আঁচলে মোছে ফতু।

‘হারামজাদা মানুষ অইলো না। এমন সোন্দর ভাঙ্গারির দোকানডা হালায়া থুইয়া অসুদ বেচত বইছে। তোর মামায় মরনের লগে আমার সংসারে শনি লাগছে’

‘কি অসুদের দোকান মামী?’ শান্তস্বরে জানতে চায় ফতু।

‘কি জানি কয়! নানান কিছিমের অসুদ। হের অসুদ খাইলে বলে আটকুড়াগো ছাওয়াল পয়দা অয়, ক্যানসার বালা অয়। কয়দিন পর পরই বউরে আইন্যা খাওয়ায়! কই, চাইর বচ্চরেও তো ছাওয়াল ফাওয়াল অইলো না।’ হঠাৎ করেই যেন মেজাজ বিগড়ে যায় আনোয়ারা বেগমের।

‘চিন্তা কইরেন না মামী। দেখবেন বাচ্চা কাচ্চা ঠিকই অইবো’ উঠে দাঁড়ায় ফতু।

‘কিয়ের অইবো! আটকুড়াই থাকবো অয়। এই দোকানও লাডে উঠবো। কয়দিন পর খয়রাত করন লাগবো। বউ একখান ঘরে হুইয়া বইয়া থাকবো। একটা কামে লাগলেও তো দুইডা টেহা ঘরে আইয়ে।’ রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে আনোয়ারা।

‘খয়রাত করন লাগবো ক্যা মামী? ভাবীর বাপতো অনেক বড় লুক আছে’ খোঁচা দেয়ার ভঙ্গিতে বলে ফেলে ফতু। সাত চড়ে রা করবার মতন যে মেয়ে নয় সে। তবুও জীবন যেন তাকে অনেক কথা বলতে শিখিয়েছে।

রীতিমতন গর্জে ওঠে আনোয়ারা। বুঝতে পারে ফতুকে বউ না করায় শোধ নিচ্ছে মেয়েটা। ‘হারামজাদী, আমি মরি আমার দুঃখে আর হ্যায় আইছে খোঁচা মারতে। বাইর হ ঘর থিকা।’

ছেলে কোলে নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে ফতু। জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ে। বুকের মধ্যে চেপে থাকা বহুদিনের একটা কষ্ট যেন মিশে যায় সন্ধ্যার বাতাসে। গোর-এ শহীদ মাজারের পাশের ফুটপাতে কাপড় বিছিয়ে চর্ম, যৌন, ক্যানসার, ডায়াবেটিকস, হৃদরোগসহ হাজারো রোগের বড়ি নিয়ে বসে আছে বশির। সামনে দিয়ে যাবার সময় ফতু দেখতে পায়- নানান বয়সের লোকজন বশিরের কাছ থেকে বুঝে নিচ্ছে ঔষধের হরেক রকম গুণাবলী।