• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

পোস্টমডার্নিজম, উত্তরআধুনিকতা এবং উত্তরচেতনা

জিললুর রহমান

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

image

শিল্পী : কাইয়ুম চৌধুরী

(পূর্ব প্রকাশের পর)

গ. উত্তরআধুনিকতা

পোস্টমডার্নিজমের বিপরীতে সেই বিবেচনায় উত্তরআধুনিকতা অন্বয়ের কথা বলে। উত্তরআধুনিকতা বলতে সমসাময়িক এমন এক অভিজ্ঞানকে বোঝায়, যা শিল্পসংস্কৃতির সঙ্গে কেবল নয়, আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এক সমৃদ্ধ সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করে। এই চিন্তার মূল-ভাবনা দাঁড়ায় আধুনিকতা থেকে উত্তরণ অর্থে, উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে নিজেকে পুনর্মূল্যায়ন করা। ঔপনিবেশিক গ্রেকোরোমান-হেজিমনির বিপরীতে নিজের শাশ্বত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পুনর্পাঠ ও অনুসন্ধান। অঞ্জন সেনের ভাষায়Ñ “এখন বিশ্বায়নের যুগ, কয়েকটি অর্থনৈতিক শক্তিশালী রাষ্ট্রের আধিপত্যের যুগ, এবং তার প্রবণতা সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার, এটা সর্বজনীন নয়। উত্তরআধুনিক চেতনা এ আধিপত্যের বিরুদ্ধে সচেতন করে তোলে।’

কলকাতায় ১৯৭৩ সালে অমিতাভ গুপ্তের নেতৃত্বে প্রথম এ অভিধাটি উচ্চারিত হয়। তাঁর সঙ্গে দিলীপ কুমার বসু, অঞ্জন সেন, উদয় নারায়ণ সিংহ, বীরেন্দ্র চক্রবর্তী, তপোধীর ভট্টাচার্য প্রমুখ এই ভাবধারা সঙ্গে যুক্ত হন। তবে, এদের প্রত্যেকের লেখা পাঠ করলে দেখা যাবে যে, মূল-বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও তাদের নিজেদের মধ্যেও উত্তরআধুনিকতার চরিত্রলক্ষণ বিষয়ে বেশ-কিছু মতভিন্নতা র?েয়ছে। তবে এতটুকু বোঝা যায়, এদের সিদ্ধান্তে আধুনিকতা তার ভূমিকা হারিয়েছে, সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের সঙ্গে তাল-মিলিয়ে আধুনিকতা অবক্ষয়বাদী হয়ে পড়েছে। ব্যক্তি হারিয়েছে মানসিক দৃঢ়তা এবং বিস্তৃত হচ্ছে আত্মকেন্দ্রিকতার চর্চা। এর বিপরীতে উত্তরআধুনিকতা বলে সামগ্রিক চেতনার চর্চা এবং মানসিক দৃঢ়তার কথা। এ প্রত্যয়ের মাধ্যমে অবক্ষয় থেকে উত্তরণ লাভ এবং ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়ার চেতনাই উত্তরআধুনিকতা। উত্তরআধুনিকতা কেন্দ্রমুখিনতার বিপক্ষে প্রান্তিক-মানুষের বিকাশের কথা বলে। উত্তরআধুনিকতা মডার্নিস্টদের বা পোস্টমডার্নদের মতো ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে উপেক্ষা না-করে বরং ঐতিহ্যের সঙ্গে ঐক্যসূত্র রেখে ক্রমাগত অগ্রসারমানতার সপক্ষে। পশ্চিমবঙ্গে এই চিন্তাধারার সঙ্গে যদিও কবিদের সংযোগ বেশি হয়, শিল্পী গনেশ পাইন, সত্রাজিৎ গোস্বামী, শ্যামল কুমার ভট্টাচার্য-সহ বেশকিছু চিত্রশিল্পীও এই চেতনাপ্রবাহে যুক্ত হন। বিপুল চক্রবর্তী, অনুশ্রী চক্রবর্তী, উৎপল ফকিরসহ আরো সঙ্গীতশিল্পীও এই কর্মযজ্ঞে শামিল হন। এদিকে আশির শেষদিক থেকে বাংলাদেশেও প্রধানত কবিদের মধ্যে দীর্ঘ-অবসাদময় আধুনিক চিন্তামগ্ন কবিতাচর্চা থেকে বেরিয়ে আসার নানা-প্রয়াস চলে। একবিংশ সম্পাদক খোন্দকার আশরাফ হোসেন এ-বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। আবার ফরিদ কবির, সাজ্জাদ শরিফ-সহ একদল তরুণও বিকল্প খোঁজায় প্রয়াসী হন। ১৯৮৯ সাল থেকে লিরিক সম্পাদক এজাজ ইউসুফী বারবার নতুন কাব্যচিন্তার কথা বলে আসলেও বস্তুত ১৯৯২ সালে একবিংশ প্রথম উত্তরআধুনিকতা বিষয়ে অঞ্জন সেনের একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে। তবে, ১৯৯৩ সালে এজাজ ইউসুফীর সম্পাদনায় ছোটকাগজ লিরিক প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ উত্তরআধুনিক কবিতা সংখ্যা বের করে। যার প্রভাব ঢাকায় কমবেশি অনুভূত হলেও এর বিশাল প্রভাব পড়ে প্রান্তিক জেলাগুলোতে এবং লিরিক বিপুলভাবে সমাদৃত হয় পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের উত্তরআধুনিকদের মধ্যে। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৯৫ সালে লিরিক উত্তর আধুনিক কবিতা সংখ্যা-২ প্রকাশিত হলে বাংলাদেশে উত্তর আধুনিকতার চিন্তার ধরনটি কিছুটা পরিস্ফুটিত হয়। আর এখানেও দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গীয় উত্তরআধুনিকতা এবং বাংলাদেশের উত্তরআধুনিকতার ক্ষেত্রে চিন্তাচর্চায় বেশ পার্থক্যও রয়েছে। এসময়ে একবিংশ, নিসর্গ, গা-ীব, প্রান্ত, নদী, অনিন্দ্য, কারুজ, প্রতিশিল্প, প্যাঁচা, নৃ-সহ আরো অনেক ছোটকাগজ আধুনিকতাকে প্রত্যাখ্যান করা, উত্তরকাঠামোবাদী চিন্তাচর্চা ইত্যাদির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। যদিও সরাসরি উত্তরআধুনিকতা শিরোনামে এরা কাজ করেননি, তবু তাদের লেখাপত্রগুলো কিছু উত্তরআধুনিকতা আর কিছু পোস্টমডার্ন চিন্তার সঙ্গে সমান্তরাল ছিল। উত্তরআধুনিকতা কিংবা সমান্তরালে চলমান উত্তরকাঠামোবাদী কিংবা সামগ্রিক কবিতাচর্চার এই প্রচেষ্টা যে বৃথা যায়নি, তা-খুব সহজেই টের পাওয়া যায়, যখন নব্বই থেকে কবিতার ভাষা-আঙ্গিক-উপমা সবকিছুই দেখা যায় আধুনিক কবিতার মধ্যআশি পর্যন্ত চলমান কবিতার সার্বিক প্যাটার্ন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গিয়েছে। আজকের যে তরুণ কোন-তত্ত্ব বা দর্শন না-জেনে সহজাত স্বরে কবিতা লিখছে, সেও এই উত্তরআধুনিকতা কালপর্বে আপনা থেকেই প্রবেশ করছে। সে-সময় লিরিকের এজাজ ইউসুফী, জিললুর রহমান, পুলক পাল, সোহেল রাববি, সাজিদুল হক, হাবিব আহসান, রিজোয়ান মাহমুদের সঙ্গে উত্তরআধুনিকতার কর্মযজ্ঞে শিল্পী ঢালী আল মামুন, তাসাদ্দুক হোসেন দুলু, গৌতম চৌধুরী, নাট্যকার মিলন চৌধুরীও সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

পোস্টমডার্নিজমের অর্থহীনতা ও বি-মানবিকীকরণের বিপরীতে উত্তরআধুনিকতা অর্থময়তা ও মানবিকতার পক্ষে বক্তব্য রাখে। পোস্টমডার্ন-সাহিত্য বাস্তবতাকে প্রতিফলন করতে চায় না, বরং চায় হাইপার-রিয়েলিটি তৈরি করতে। ফকেমা তার নিবন্ধে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, কেন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে পোস্টমডার্নিজম সম্ভব নয়, এবং পরবর্তীতে আরেকটি পৃথক নিবন্ধে উত্তর আধুনিকতার পৃথক অস্তিত্বের কথাও মেনে নেন। উত্তরআধুনিক চেতনা মনে করে আমাদের যাবতীয় কৃষ্টির উৎস লোকসাহিত্যের অবদান। তার সঙ্গে নানাবিধ লোকসঙ্গীত, যেমন ছৌ, গম্ভীরা থেকে শুরু করে সত্যপীরের পাঁচালী, ব্রতকথা, পালাগান ইত্যাদি; এক কথায় কৃষিভিত্তিক বাংলা এবং সেই সঙ্গে ভারতবর্ষের সমস্ত রকম লোকবৃত্ত সাহিত্য ও সৃজনকর্মের প্রেরণা, যা পঞ্চাশের আধুনিকগণের কাছে অবহেলিত।

ন্যায়দর্শন শাস্ত্রের সূত্রে এবং মার্কসীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সূত্রে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্তহীন ক্ষেত্রকালতত্ত্বের সূত্রে, উদ+তর অর্থাৎ উত্তর শব্দটিকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১৯৭৩ সালে উত্তরআধুনিক চেতনা উত্থাপিত হওয়ার আরও বছর পাঁচেক পরে বাংলাসাহিত্যে পোস্টমডার্নিস্টরা কাজ শুরু করেন। এদিকে ১৯৮৯ সালে ‘সাম্প্রত’ পত্রিকায় প্রকাশিত অমিতাভ গুপ্তের একটি প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় ঐ বছরেই ‘প্রমা’ পত্রিকায় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত একটি পত্রনিবন্ধ লেখেন, যার উত্তর-প্রত্ত্যুত্তরে একটা দীর্ঘ-বিতর্ক বেশ-কিছুদিন চলমান থাকে। পরবর্তীতে অঞ্জন সেন, উদয় নারায়ণ সিংহ, শুভা চক্রবর্তী দাশগুপ্ত, রাজীব চৌধুরী, জয়ন্ত মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বাংলার উত্তরআধুনিক সাহিত্যচিন্তা’ গ্রন্থে সংকলিত হয়। এখানে বেশ-ক’টি প্রবন্ধের ভেতরে উত্তরআধুনিক চেতনা বিষয়ে অনেক গভীর আলোচনা করা হয়, এবং সেইসঙ্গে এই চেতনার কিছু চরিত্রলক্ষণও চিহ্নায়নের চেষ্টা চলে। প্রদীপন দাশগুপ্ত তার ‘উত্তরআধুনিক রাষ্ট্রের সন্ধানে’ প্রবন্ধে “কোন বিশ্বে উত্তরআধুনিকতার জন্ম?’ প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে লেখেন ‘মূলত শক্তির ভারসাম্যহীন, একগামী, আধিপত্যশীল এক বিশ্বব্যবস্থা—সমাজ-সংস্কৃতি-বাস্তবতা সম্পর্কে যার ধারণা অত্যন্ত প্রাচীন। এই বিশ্বের মূলমন্ত্র বিশ্বজনীনতা। সকলের জন্যে ‘সত্য’ ও ‘বিশ্বাস’ এক। মানুষের ব্যক্তিচেতনা তাই কেবল ‘ব্যক্তিগত’ নয়, ‘রিলেশনাল’। আমরা ‘বাস্তব’কে চিনতে শিখি ক্রমাগত অন্যের প্রতি-তুলনায়। আমাদের আত্মিক সংলাপও এক সামাজিকতায় আবদ্ধ। কারণ আমাদের ভাষাশিক্ষা অপরের কাছ থেকে আহৃত।” এখানেই পোস্টমডার্নদের সঙ্গে উত্তর আধুনিকতার পার্থক্য পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। উত্তরআধুনিক চেতনা তাই অন্বয় তৈরি করে সহগ্র-অযুত-বর্ষের মানব-সংস্কৃতির সঙ্গে, যার যোগসূত্র হয়ে ওঠে একদিকে লোকসাহিত্য-মিথ-প্রাচীন মহাকাব্য থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক তথ্যসূত্র পর্যন্ত। তাই, ইতিহাসের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং ইতিহাসের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরির মধ্য দিয়ে, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির স্বপ্ন-রচনা নয় বরং সামাজিক মানুষের মিলিত উত্তরণের সংকল্প ব্যক্ত হয় উত্তরআধুনিকতায়। এখানেই পোস্টমডার্নিজমের সঙ্গে উত্তরআধুনিকতার সবচেয়ে বড় বিবাদ। কিন্তু আধুনিকতার বিরোধিতায় সমানভাবে মুখর। তাই এজাজ ইউসুফীর ভাষায় “উত্তরআধুনিকতা হচ্ছে পোস্টমডার্নিজমের সমমাত্রিক একটি বিপরীত অভিঘাত।”

যদি ভাবি, “কোনো শিল্পকর্ম থেকে কি সত্য লাভ করা সম্ভব? এমন প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ সূচকই। সতের শতকের ওলন্দাজ জড়জীবনের একখানা চিত্রকর্ম থেকে ধারণা পাওয়া যায় তারা কী খেতে বা পান করতে পছন্দ করতো। তেমনি প্রতিকৃতি থেকে জানা যায়, তারা কোন ধরনের পোশাক পরত। মোৎজারটের সঙ্গীত থেকে জানা যায় কী বাদ্যযন্ত্র তিনি বাজাতেন। জাপানী হাইকু থেকে জানা যায় ধ্যানমগ্ন জীবনের পবিত্রতা। সত্য শিল্পকর্ম থেকে অনুমান করা সম্ভব...। এ-জগতের যে কোন-কিছু থেকে সত্য বেছে নেওয়া সম্ভব।” অবক্ষয়ী আধুনিকগণ স্পেশালাইজেশনের ধারণার কথা বলেন। কিন্তু উত্তরআধুনিকগণ মনে করেন আনুপূর্বিক সমন্বয়ের জ্ঞান সকলের কাম্য। তারা চায়, বিভিন্ন যুগের মধ্যে পারস্পরিক সেতুচিহ্ন এবং সংযোগরেখাগুলি যেন উত্তরআধুনিক কবি মানসে ধরা পড়ে। ইতিহাস-বিকৃতি যেন উত্তরআধুনিক কবি-মনে স্পর্শ না করে।

বাংলাদেশে উত্তরআধুনিকতা চর্চা নানাদিকে মোড় নেয়। লিরিকের সঙ্গে-সঙ্গে কালধারা এবং সুদর্শনচক্র-সহ বেশ কিছু ছোটকাগজ মিলে দার্শনিক চিন্তাচেতনা অপেক্ষা এটাকে কাব্যচিন্তা বা কাব্য আন্দোলনের দিকে পরিচালিত করে। রিজোয়ান মাহমুদের কথায়, “উত্তরআধুনিকতা চিন্তার নৈরাজ্য থেকে বেরিয়ে আসা একটি সৌম্য-স্নিগ্ধ-কাব্যদর্শন। আধুনিকতা ও ইউরোকেন্দ্রিকতার যে কটুভাষ সীমাবদ্ধতা বাংলা কবিতাকে এতোদিন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তার বিপক্ষে গিয়ে ভাষা ও বিষয়ের নতুন-বিন্যাস। এখানে ইতিহাস-ঐতিহ্যের নবায়ন যেমন আছে, তেমনি ভাষার ভেতরে থেকে বিষয়ের নতুন চমকও। উত্তরআধুনিকতা ধরতে চেয়েছে লোকায়ত জীবনজিজ্ঞাসা, আধ্যাত্মবাদী মরমি-চেতনা, ইতিহাসের ভেতরের সত্যনিষ্ঠ জাগরণ, সর্বোপরি মানবিক কল্যাণবোধ, যাতে প্রশস্ত হয় সেই আবেগজাত অনুভূতির জায়গা। আধুনিকতার ভাষাপ্রবাহে অনর্থক একটা উল্লম্ফন, অনর্থক-বিমূর্ততা তৈরির একটা নেশা ছিল; উত্তরআধুনিকতা এই-বিমূর্ততা থেকে বয়ান ও বুননের জায়গায় সরল-সুন্দর-বিনির্মাণ। এখানে দেশ থাকবে, থাকবে মাটির আকুল করা গন্ধ। কবিতা হবে সর্বদুয়ারী, বোধে পরিপক্ব। এই অনুষঙ্গ বিগত দশকের কবিতায় প্রাপ্তিযোগ্য হলেও ভাষার অনুশাসনে এবং পশ্চিমা পীড়নে মনে হয়েছে এতদিন কেবল পাশ্চাত্য কবিতার অনুবাদ করেছি। পাশ্চাত্য আমাদের যেমন এখনো একটা নয়া উপনিবেশ করে রেখেছে, ভাবনাচিন্তার জায়গায়ও আমরা পরাধীন। পরাধীনতার একটা শৃঙ্খল দাসানুদাস করার মনোবৃত্তি তাদের সর্বত্র বজায় ছিল। এই নৈরাজ্য এবং পাশ্চাত্যের আমিত্ববাদের মহল ভেঙে কবিতাকে আমাদের মতন পেতে চেয়েছি, যেখানে সহজ সরল ভাষায় জীবনের অনুষঙ্গ থাকবে, চিন্তার স্বপ্ন থাকবে। উত্তর আধুনিকতা দাসখত যেহেতু দেয়নি, সেহেতু তার ভাষাপ্রবাহের সারল্য চেতনায় নিজের মুখ দেখা ও চেনার বিষয়ে উত্তরআধুনিকতাই প্রাচ্যদেশীয় কাব্যসংবিধান। আমরা এভাবেই ভাবছি, ব্যক্তি চেতনার বদলে যৌথচেতনা।”

সাজিদুল হকের ভাষায়, “দীর্ঘ সময়কাল ধরে চলে-আসা ধারণাকে ভেঙে নতুন-পথ শুধু তৈরি তো নয়, সেই নতুন-পথে চলতে জানতেও হয়। সেই যে এঁকেবেঁকে গেছে, সেই পথ বন্ধুর, ভয়ের, হারানোর ভয়। অথচ এই ভাঙাভাঙি আর এই কষ্টকর পথ চলা কখনো অভ্যস্ত রীতির অনুসারী যে-কারো পক্ষেই অসম্ভব।

লিরিক-এর সম্পাদকীয়তে উত্তর আধুনিকতার স্বরূপ আঁকতে গিয়ে এজাজ ইউসুফী উপনিবেশবাদ-ভক্ত চিন্তকদের ধারণাকে নিষ্ফল করে দিয়ে ফিরতে চায় মৌলিক ঐক্যের ধারায়, ফিরতে চায় উত্তরআধুনিকতায়। যৌথচেতনায় সৃষ্টি হবে ক্রমবিকাশের ধারা, রক্ষণশীলতার সার্বক্ষণিক পাহারার বিরুদ্ধে মার্কস নির্ধারিত ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের নির্ণায়ক উপাদানে স্মরণীয় হয়ে উঠবে বাংলার বিকেন্দ্রিত মাটি। তাই ভাষা-ব্যবস্থায় বর্জিত হচ্ছে অধিবিদ্যার মুখ্য-নিয়ন্ত্রণ। ছেদ পড়েছে পাঠ ও পাঠক্রমে। সংশ্লিষ্ট সমালোচনার ধারায় ঢুকে গেছে বিপরীত লিঙ্গের অভিঘাত। ভাবনা ভাবিত করে তুলছে চিহ্নের গতিপ্রকৃতি। দীপায়ন-নেতিভাষ্যে কেঁপে উঠছে মনগড়া ধারণার ভিত। শ্বেতকায় মানুষের মডেলে যারা করেছেন ইতিহাসের পাঠ, অসম্ভব আজ সেসব। প্রশ্নের মুখে ফুৎকারে উড়ে যাচ্ছে ছিন্ন হাত পা। নির্মিত হচ্ছে পালটা দার্শনিকতার প্রাণ। উত্তর সমাজ ব্যবস্থায় গড়ে উঠবে সিভিল মানুষের কৃৎকৌশল। কথনের নিরাবেগ ছন্দে দুলছে ধ্বংসের বিরুদ্ধে নয়াচেতনার ভাষ্য”।

এই উত্তরআধুনিক চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ যেহেতু ঐতিহ্যের সঙ্গে অন্বয়, সে-কারণে বাংলাদেশে এবং পশ্চিমবঙ্গে চলমান উত্তরআধুনিকতার চর্চা করতে গিয়ে অনেকেই প্রাচীন-মিথ, পুরাণ, ধর্মীয় উপকথা, লোককাহিনী ইত্যাদির চর্চায় অনেক বেশি ব্যাপৃত হয়। অনেকে যুক্তিবাদিতার পরিবর্তে অধ্যাত্মপন্থায়ও উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়ে। একটি ক্ষুদ্রগোষ্ঠী এই উত্তরআধুনিকতাকে মৌলবাদিতার দিকে পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। আবার যেহেতু উত্তরআধুনিকতা কেন্দ্রমুখিনতার বিপক্ষে প্রান্তিক বিকাশের কথা বলে, দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন স্থানিক অবস্থান থেকে উত্তরআধুনিকতার লেখকেরা বেশকিছু পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও রাখতে থাকেন। কেউ পোস্টমডার্নিজমের আদলেও ভাবার চেষ্টা করে দুই বিবদমান মতাদর্শের মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করেন। আবার তুষার গায়েন পারিভাষিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে এই বিষয়গুলো নিয়ে কী ধরনের চিন্তাভাবনা রয়েছে তার ব্যাখ্যা করেন এবং পোস্টমডার্নের সঙ্গে উত্তরআধুনিকের পার্থক্য কবিতার ক্ষেত্রে কীভাবে চিহ্নিত হচ্ছে তা আলোচনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, “বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি আধুনিকতাবাদী দর্শন ও শিল্পসাহিত্যের অন্তিমদশা উপনীত হলে, এর থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে পোস্টমডার্ন / উত্তর আধুনিক / অধুনান্তিক জীবনবোধ ও দর্শনের উন্মেষ ঘটতে থাকে যার দু’টি ধারা : একটি হচ্ছে আধুনিকতাবাদী জীবনব্যবস্থায় মানুষের উপর মানুষের সব রকমের কর্তৃত্ব নিরসনের উপায় হিসাবে নৈরাজ্যবাদে আত্মসমর্পণ; অন্যটি হচ্ছে আধুনিকতার অবক্ষয়ী ও খ-ত্ববাদী জীবনদর্শনের বিপরীতে অখ-বাদী জীবনবোধের চর্চা যা উত্তর-ঔপনিবেশিক অন্বেষণে স্বদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মাটি ঘনিষ্ঠতায় মুখর। শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে, প্রথমোক্ত ধারা প্রধানত ভাষা ও আঙ্গিকবাদী যেখানে মানুষের উপস্থিতি গৌণ; দ্বিতীয় ধারায় মানুষের উপস্থিতিকে মুখ্য জ্ঞান করে ভাষা ও আঙ্গিককে মুক্ত করার প্রেরণায় সৃষ্টিশীলসত্তা উন্মুখ ও ক্রম প্রকাশমান”।

১৯৮৭ সাল থেকে এ সময়কালের মধ্যে বাংলাদেশে এবং আসাম-ত্রিপুরা-পশ্চিমবঙ্গে উত্তরআধুনিকতা বিষয়ে বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগে উত্তরআধুনিকতা পাঠ্য হয়েছে। আমাদের গ্রন্থ তাদের পাঠাগারে সংরক্ষিত; ছাত্রদের মধ্যে পঠিতও হচ্ছে। বিশেষত, লিরিকের উত্তরআধুনিক কবিতা সংখ্যাগুলো বিভিন্ন গবেষণায় এবং উত্তরআধুনিক চিন্তকদের মধ্য পঠিত-পুনর্পঠিত হয়েছে বহুবার। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমপক্ষে ৮ জন উত্তরআধুনিকতা বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন। সম্প্রতি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়েও উত্তর আধুনিকতা পাঠ্য হয়েছে। অঞ্জন সেন ও উদয় নারায়ণ সিংহ সম্পাদিত বাংলা উত্তরআধুনিক সাহিত্যচিন্তা, দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত উত্তরআধুনিক কাব্যচেতনা, তনুশ্রী ভট্টাচার্য সম্পাদিত ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত The Uttaraadhunik, এজাজ ইউসুফীর ‘উত্তর আধুনিকতা : নতুন অন্বয়ের প্রেক্ষিত’, জিললুর রহমানের ‘উত্তর আধুনিকতা : এ সবুজ করুণ ডাঙায়’, তপোধীর ভট্টাচার্যের ‘পর্ব থেকে পর্বান্তরে’, তুষার গায়েনের ‘অধুনান্তিকতার অভেদ সন্ধান’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলো এই চিন্তাধারার বলিষ্ঠ উপস্থিতি প্রকাশ করে। অঞ্জন সেন, সুস্নাত জানা, প্রদীপন দাশগুপ্ত প্রমুখ বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেছেন। অনেকের অগ্রন্থিত প্রবন্ধ বিভিন্ন ছোটকাগজে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে খোন্দকার আশরাফ হোসেন, রিজোয়ান মাহমুদ, সাজিদুল হক, পুলক পাল উল্লেখযোগ্য। উত্তরআধুনিক কবিতা সংকলনও হয়েছে বেশ কয়েকটি। ২০০০ সালে ইংরেজিতে অনূদিত কবিতার সংকলনও প্রকাশিত হয় ‘After and Before’ শিরোনামে অমিতাভ গুপ্তের সম্পাদনায়। এর মধ্যে বেশ কিছু সম্মেলনে মিলিত হয় উত্তরআধুনিকগণ। বাংলাদেশে তো আছেই, আমার সৌভাগ্য হয় ২০১১ সালে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে কলকাতায় এবং ২০১৯ সালে বালুরঘাটে কয়েকটি সম্মেলনে সম্পৃক্ত হবার। (চলবে)