• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬, ২৯ রজব সানি ১৪৪১

পরদেশি সাহিত্যের গহন অরণ্যে

মাহফুজ আল-হোসেন

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

image

আমার বাড়ির পরিবেশ বাল্যকাল থেকেই ছিল পাঠানুকূল। আমার পিতার ছিল বই ও সাময়িকীর বিরাট সংগ্রহ। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধের সময় এসব সংগ্রহের পুরোটাই খোয়া গিয়েছিল। পরবর্তীতে আবার নতুন করে বইপত্র এবং সাময়িকীর সংগ্রহ গড়ে তোলা হয়, যা উত্তর প্রজন্মেও অব্যাহত আছে। একটা বয়স পর্যন্ত আমাদের শিশুতোষ বই ছাড়া অন্য বই পড়ার ক্ষেত্রে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা এবং তদারকি ছিল। সেইসব নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল অতিক্রম করে লুকিয়ে বড়দের বই পড়ার ব্যাপারে সাহসী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন আমার অগ্রজ বড় আপা। আমি একটু ভীতু টাইপের হওয়ায় শৈশবের বেশ কিছুকাল শিশুসাহিত্যের পাতায় আটকে গিয়েছিলাম। একটু বড় হলে বড় আপার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ছোটদের বইয়ের পাশাপাশি বড়দের বই পড়া শুরু করি। আমার পড়া শিশুসাহিত্যের মধ্যে বহু বিদেশি লেখকের অনূদিত লেখাও ছিল। বনের পশুদের নিয়ে ঈশপের উপদেশমূলক গল্প, গ্রীম ভাইদের কাহিনি, হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসনের ‘আগ্লি ডাকলিং’সহ চমকপ্রদ সব রূপকথা, রাশিয়ার অসাধারণ সব উপকথা (যার মধ্যে রাজকুমার ইভান এবং রাজকুমারী ভাসিলিসার কাহিনি এবং ‘কুড়ালের জাউ’ গল্পটির কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে)। বিশেষ করে, ভাল লেগেছিল রাশিয়ান লোককাহিনি পাভেল বাজোভ-এর ‘মালাকাইটের ঝাপি’। জোনাথন সুইফ্ট-এর ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’ কিংবা

জোনাথন সুইফ্ট-এর ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’ কিংবা সার্ভেন্টেস-এর ‘ডন কুইক্সোট’ পাঠ্যবই হিসেবে যখন পড়েছিলাম তখন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি যে, ওগুলো ছিল তৎকালীন সময়ের স্যাটায়ারধর্মী রূপক কাহিনী। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনক জুলভার্ন-এর বইয়ের প্রতি ছিল আমার অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ

সার্ভেন্টেস-এর ‘ডন কুইক্সোট’ পাঠ্যবই হিসেবে যখন পড়েছিলাম তখন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি যে, ওগুলো ছিল তৎকালীন সময়ের স্যাটায়ারধর্মী রূপক কাহিনী। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনক জুলভার্ন-এর বইয়ের প্রতি ছিল আমার অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ। বিশেষ করে, ‘এরাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইজ’, ‘জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ’, ‘টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস্ আন্ডার দ্য সি’, এবং ‘দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড’ অন্যতম। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর আরেক দিকপাল এইজি ওয়েলস-এর দুনিয়া কাঁপানো দু’টি উপন্যাস ‘টাইম মেশিন’ এবং ‘দ্য ইনভিজিবল ম্যান’-এর কথা এখনও বিশেষভাবে মনে পড়ে। তবে, আমার মনে প্রচ-ভাবে দাগ কেটেছিল রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর বই ‘গ্রহান্তরের আগুন্তুক’। বইটিতে আনাতেলি দ্নেপ্রভ-এর দুটি উপন্যাস ম্যাক্সওয়েল সমীকরণ’ (মানুষকে বন্দি করে কৃত্রিমভাবে তাকে গাণিতিক প্রতিভায় রূপান্তরিত করার নিষ্ঠুর অথচ আশ্চর্যজনক কাহিনী) এবং ‘আইভা’ (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবটের কাহিনী যা অত আগে কীভাবে লেখক কল্পনা করেছিলেন ভাবলে অবাক হতে হয়)। আলেকজান্ডার বেলায়েভের আরেকটি চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক কল্পোপন্যাস পড়ে সে সময় শিহরিত হয়েছিলাম, সেটি হলো ‘উভচর মানুষ’। কালো মানুষদের প্রতি শেতাঙ্গদের নির্মম অত্যাচারের কাহিনী ‘আঙ্কল টমস্ কেবিন’ পড়ে আমার মন অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিল, এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আ্যলেক্স হ্যালির ‘রুটস’ উপন্যাস পড়েও বিমোহিত হয়েছিলাম এবং নিজের শিকড় খোঁজার প্রতি তাগিদ অনুভব করেছিলাম। অভিযানমূলক যেসব কাহিনী আমার শিশুমনে বিশেষভাবে রেখাপাত করেছিল এদের মধ্যে রবার্ট লুই স্টিভেনসন এর ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ (তার অপর কল্প-কাহিনীর বই ‘ডক্টর জেকিল এন্ড মিস্টার হাইড’ পড়েও রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম) এবং মার্ক টোয়েনের ‘দ্য এ্যাডভেঞ্চারস অব টমস্যায়ার, দ্য এ্যাডভেঞ্চারস অব হাকলবেরিফিন’ অন্যতম। চার্লস ডিকেন্সের ‘ডেভিড কভারফিল্ড’ পড়ে ডেভিডের ভাগ্যবিড়ম্বিত শৈশবের জন্য মনে অনেক দুঃখ জমা হয়েছিল। ডিকেন্সের ‘এ টেল অব টু সিটিজ’ অনু-উপন্যাসটি পড়েও বেশ ভালো লেগেছিল। ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজারেবল’ পড়ে একটি রুটির জন্য কীভাবে একজন অভাগা মানুষ নিষ্ঠুর বন্দি জীবনের সম্মুখীন হতে পারে তা ভেবে গভীর দুঃখবোধের মধ্যে নিপতিত হয়েছিলাম। বইটি সম্পর্কে শোনা যায়, এটি প্রকাশিত হওয়ার পরে হুগো তার প্রকাশককে শুধুমাত্র একটি জিজ্ঞাসা চিহ্ন (?) লিখে পত্র পাঠিয়েছিলেন, প্রকাশক পত্রের জবাবে একটি বিস্ময়সূচক চিহ্ন (!)-এর মাধ্যমে জানিয়ে দেন যে, বইটির ব্যাপক কাটতি এবং এটিই আমাদের জানা মতে পৃথিবীর সংক্ষিপ্ততম পত্রালাপ। মার্থা নোকার্ট-এর ‘আই ওয়াজ এ স্পাই’-সহ বিশ^যুদ্ধকালীন উত্তেজনাকর গুপ্তচরবৃত্তির কাহিনীগুলো পড়ে ভীষণ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। কিশোরী এনি ফ্রাঙ্কের যুদ্ধদিনের ডায়েরি পড়ে অত্যন্ত আবেগতাড়িত হয়েছিলাম।

দুই

কলেজ জীবন থেকে বিশ^সাহিত্যের বিভিন্ন বই পড়তে শুরু করি- যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। সকলের মতোই প্রথমদিকে ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক্সগুলোর প্রতি আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। তবে পাঠ্য-অপাঠ্য যাই হোক না কেন, বিদেশি সাহিত্য পাঠের প্রতি দুর্বলতা আমার এখনও রয়েছে। পাঠক হিসেবে বিদেশি সাহিত্যের যেসব বই পড়ে আমি নিজের মনোভূমিকে আলোকিত করবার প্রয়াস পেয়েছি তার মধ্যে রয়েছে লিও টলস্টয়ের ‘ওয়ার এ্যান্ড পীস’, ‘আনা ক্যারেনিনা’ এবং ‘রেজারেকশন’; ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’, বরিস পাস্টারনাকের ‘ডক্টর জিভাগো’, আলবেয়ার কামুর ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার,’ ফিওদর দস্টয়ভস্কির ‘ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট’, ফ্রাঞ্জ কাফ্কার রূপকধর্মী বিখ্যাত উপন্যাসিকা ‘দ্য মেটামরফোসিস’ (গ্রেগর সামসা নামে এক ব্যক্তি সকালে ঘুম থেকে উঠে বৃহদাকার এক পতঙ্গে রূপান্তরিত হওয়ার এক প্রতীকী কাহিনী), গুন্টার গ্রাসের তিনটি বিখ্যাত উপন্যাস যা ড্যানজিগ ট্রিলজি নামে পরিচিত- ‘দ্য টিন ড্রাম’, ‘ক্যাট এন্ড মাউস’ এবং ‘দ্য ডগ ইয়ার্স’; অরওয়েল প্রতীকী উপন্যাস ‘এ্যানিম্যাল ফার্ম’ এবং ভবিষ্যৎদর্শী কল্পকাহিনী ১৯৮৪, মার্কিন ঔপন্যাসিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’ (কিউবান প্রবীণ মৎস্য শিকারীর সমুদ্রে বৃহদাকার মার্লিন মাছধরার শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী), এরিক মারিয়া রিমার্কের ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা হৃদয়বিদারক উপন্যাস- যার ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র দেখবার সুযোগ হয়েছে), পার্ল এস বাকের ‘গুড আর্থ’ (এর রূপান্তরিত বাংলা নাটকের সিরিজ ‘মাটির কোলে’ অনেকদিন ধরে বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছিল), হারমান মেইলভেইল-এর ‘মবি-ডিক’ (এর ওপর নির্মিত হলিউডের চলচ্চিত্র পরবর্তীতে দেখার সুযোগ হয়েছে) অন্যতম। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘যাদুবাস্তব’ উপন্যাস ও ছোটগল্পসমূহ আমাকে বিশেভাবে আলোড়িত করেছে। এর মধ্যে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’ বা ‘শতবর্ষের নির্জনতা’ এবং ‘ক্রনিকল অব এ ডেথ ফোরটোল্ড’ বিশেষভাবে মনে দাগ কেটেছে। ইয়াসুনাররি কাওয়াবাতা-এর ‘স্নো কান্ট্রি’, ‘থাউজেন্ড ক্রেনস’ এবং ‘দ্য ওল্ড ক্যাপিটাল’; নাদিন গার্ডিমারের ‘দ্য কানজারভেশনিস্ট’ এবং ‘জুলাই’স পিপল’, একইসাথে আঁদ্রেজিদ-এর ‘ইসাবেল’, হোসে সারামাগোর ‘ব্লাইন্ডনেস’, এবং নাগিব মাহফুজের ‘আখেনাতেন’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। হাল আমলের ঝুম্পা লাহিড়ীর ‘ইন্টারপ্রিটার অব ম্যালাডিজ’ ও ‘দ্য নেমসেক’; অরুন্ধতি রায়ের ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ (পাঠক সমাবেশে এই বইটি যখন সংগ্রহ করতে যাই, তখন সেখানে উপস্থিত আমাদের দেশের বরেণ্য কথাসাহিত্যিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রথাবিরোধী লেখক প্রয়াত হুমায়ুন আজাদ স্যার আমাকে বলেছিলেন- এটা নিঃসন্দেহে ভালো লেখা, তবে এর চেয়ে আরো ভালো লেখা আমাদের সাহিত্যে রয়েছে) এবং তাঁর বিশ বছর পরে লেখা উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’; সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বীদের নিয়ে লুদমিলা ইউলিৎস্কায়া-এর উপন্যাস ‘দ্য বিগ গ্রিন টেন্ট’ এবং মার্কিন লেখিকা হারপার লি-এর ‘টু কিল এ মকিং বার্ড’ এবং ‘গো সেট এ ওয়াচম্যান’ (আমার বই পোকা চিকিৎসক ছোটবোনের কাছ থেকে পাওয়া যিনি আমাকে সর্বদাই বিশ্বসাহিত্যের নতুন বইয়ের খোঁজখবর দেন), পড়ে অনির্বচনীয় আনন্দের সম্মুখীন হয়েছি।

তিন

যানবাহনে দীর্ঘ ভ্রমণের সময় ক্রাইম সাসপেন্স থ্রিলার কিংবা দীর্ঘ উপন্যাস পড়তে আমার ভীষণ ভালো লাগে। একবার ভারত ভ্রমণকালে কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোরে যশোবন্তপুর এক্সপ্রেস ট্রেনে ৩৬ ঘণ্টার একটানা রেলভ্রমণে যাবার পথে শেষ করেছিলাম ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক জেফ্রি আর্চারের ‘অ্যাজ দ্য ক্রো ফ্লাইজ’ এবং ফেরার পথে শেষ করেছিলাম বিক্রম শেঠ-এর ঢাউস সাইজের উপন্যাস ‘এ সুইটেবল বয়’ (এই বইটি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত প্রথম হে ফেস্টিভাল থেকে কিনেছিলাম এবং লেখক স্বয়ং বইয়ের ওপর স্বাক্ষর দিয়ে ইংরেজিতে যা লিখেছিলেন তার অর্থ হলো : মাহফুজ, এই বইটি পড়ে তোমার ভাল লাগবে)। অফিসের কাজের সুবাদে ট্রেন কিংবা বাস জার্নিতে যেসব বই এক নিঃশ^াসে পড়ে শেষ করেছিলাম তার মধ্যে রয়েছে সিডনি শেলডনের ‘ইফ টুমরো কামস’, ‘মাস্টার অব দ্য গেম’, ‘দ্য আদার সাইড অব দ্য মিড নাইট’, ‘টেল মি ইউর ড্রিমস’, ‘ব্লাড লাইন’, ‘নাথিং লাস্ট ফরএভার’, ‘দ্য বেস্ট লেইড প্ল্যান’, ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন দ্য মিরর’, ‘মেমোরিজ অব মিড নাইট’, ‘মর্নিং নুন এন্ড নাইট’, ‘দ্য স্কাই ইজ ফলিং’। ড্যান ব্রাউনের ‘দ্য দা ভিঞ্চি কোড’, ‘দ্য লস্ট সিম্বল’, ‘এঞ্জেলস এন্ড ডেমনস’, ডিজিটাল ফোট্রেস’, ‘ডিসেপশন পয়েন্ট’, ‘ইনফারনো’। মাইকেল ক্রিখ্টন-এর কতগুলো রোমাঞ্চকর উপন্যাস পড়েছি যেগুলি হলিউডে চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে : ‘দি এন্ড্রোমিডা স্ট্রেইন’, ‘জুরাসিক পার্ক’, ‘ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড’, ‘দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড’ ইত্যাদি। এছাড়া নোরা রবার্টসের ট্রিলজি ‘থ্রি ফেইটস্’, জেফ্রি আর্চারের ‘কেন এন্ড অ্যাবেল’, উইলিয়াম ডালরিম্পলের ‘হোয়াইট মুঘলস্’ এবং খালেদ হোসেইনি’র ‘দ্য কাইট রানার’ গাড়িতে অফিসে যাওয়া আসার পথে পড়ে শেষ করেছিলাম।

চার

লুসিয়াস-এপুলিয়াস বিরচিত ল্যাটিন কথাসাহিত্যের প্রাচীনতম উপন্যাস ‘স্বর্ণগর্দভ’ এবং ফরাসি ভাষার আধুনিক উপন্যাসের পথিকৃৎ গ্যুস্তাভ ফ্লোবের-এর সাড়া জাগানো বিতর্কিত উপন্যাস ‘মাদাম বোভারি’র কিছু কিছু অংশবিশেষ যা আমার উক্ত গ্রন্থদ্বয় পাঠকালে মনে ভীষণভাবে দাগ কেটেছিল তা প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশে উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না।

‘স্বর্ণগর্দভ’ থেকে

ক) ‘আমি জবাব দিলাম : তত্ত্বগতভাবে, আমি একথা স্বীকার করি না যে, এই পৃথিবীতে কোন কিছুই অসম্ভব। এটা বলা, আর আমার উপরে যে অসীম শক্তি মানুষের প্রতিটি অভিজ্ঞতা আগে থাকতেই নির্ধারিত করে রেখেছে তার সঙ্গে টেক্কা দেওয়া একই কথা। আর আমার-আপনার জীবনে সত্যি মাঝে মাঝে এমন ঘটনা বাস্তবিকই ঘটে থাকে বা এমন নিদারুণ যে আমরা বিশ^াসই করতে চাইনে। আর সাধারণ লোকেরা তো তাকে অলীক বলেই বাতিল করে থাকে।’ (পৃ : ১৬)

খ) ‘চুলের সুন্দর বর্ণ যখন পরিপূর্ণ রৌদ্রে উদ্ভাসিত হয় কিংবা মৃদু ঔজ্জ্বল্যে চিকচিক করে কিংবা অপসৃয়মাণ আলোর সঙ্গে তা ক্রমাগত রঙ পাল্টায়- কি পুলকই না জাগে তা দেখতে। এখুনি সোনালি, আর পর মুহূর্তেই মধুরও, কিংবা এখুনি দাঁড়কাকের পাখার মতো কালো কিংবা হঠাৎ যেন পায়রার ঘাড়ের ম্লান নীল আভায় অপসৃত।... আহা, মাথার ওপর জড়ো-করে-রাখা কেশপাশ নারীর এলো খোঁপার ঐশ^র্য! কিংবা তার চাইতেও মনোরম, সুপ্রচুর তরঙ্গভঙ্গে সে চুল যখন তা কাঁধের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সাদা কথায় এইটুকু বলেই নিজেকে তৃপ্ত মানি, যে নারীর চুলের বৈভব এমনি যে, সে যদি সবচাইতে মনোরম পোশাক এবং মূল্যবান হীরা-জহরৎ পরে এবং যদি অন্য সবকিছুও যথাস্থানে রাখে তবু তাকে সাধারণভাবেও সুসজ্জিত বলা যাবে না, যদি না কি সে ঠিকভাবে তার কেশবিন্যাস না করে থাকে।’ (পৃ : ২৯)

গ) ‘বৃদ্ধ লোকটি তার হাত দুটি চুম্বন করে প্রার্থনার আচারনিষ্ঠ ভঙ্গিতে তার পা দুটি জড়িয়ে ধরলো : হে পরম শ্রদ্ধেয় দয়া কর। স্বর্গের নক্ষত্রের দোহাই, পাতালের দেবতাদের দোহাই, প্রকৃতির পঞ্চভূতের দোহাই, রাত্রির নৈঃশব্দ্যের দোহাই, কপ্তিক দ্বীপে দেবী আইসিসেস চড়–ইরা যে বাঁধ তৈরি করেছিল তার দোহাই, নীল নদের বন্যার দোহাই, মেমফিসের রহস্যের দোহাই এবং দোহাই ফারাওদের পবিত্র ঝুমঝুমির- সবকিছু পবিত্রের নামে তোমায় মিনতি করছি, আমার ভ্রাতুস্পুত্রের আত্মাকে সামান্য মুহূর্তের জন্য সূর্যের উত্তাপে ফিরে আসতে দাও, যেন তার চোখ দুটি পুনরায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং মৃতের রাজ্যে পতিত হওয়ার জন্য যে দৃষ্টি থেকে সে বঞ্চিত হয়েছে মুহূর্তের জন্য সেই দৃষ্টি পেয়ে যেন সে চোখ খুলে যেতে পারে।’ (পৃ : ৪৩)

ঘ) ‘কোন সুশ্রী যুবকের প্রেমে পড়লেই সে পরম উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে এই ইন্দ্রজাল প্রয়োগ করে। আপাতত সে একটি বোয়েশিয়ান যুবকের প্রেমে উন্মত্ত। লোকটি সত্যি আশ্চর্য সুন্দর। তাকে বশীকরণ করার জন্য সে এখন তার শ্রেষ্ঠ ইন্দ্রজাল প্রয়োগ করছে। কাল সন্ধ্যায় শুনছিলাম, সূর্যকে সে শাসাচ্ছে এই বলে যে, সে যদি তাড়াতাড়ি ডুবে গিয়ে তার যাদু করবার জন্য যথেষ্ট সময় না করে দেয় তাহলে সে তার চারপাশে অন্ধকার মেঘ নিক্ষেপ করে তাকে পাতালের চির অন্ধকারে পাঠিয়ে দেবে।’ (পৃ : ৫৯)

‘মাদাম বোভারি’ থেকে

ক) ‘সন্ধ্যাবেলা পড়া তৈরি করার সময় সে তার ডেস্কের ভিতর থেকে তার কলমগুলি টেনে বার করল, টুকিটাকি জিনিসগুলি সাজিয়ে রাখল, যতœ করে খাতায় লাইন টানল। আমরা দেখলাম, সে নিষ্ঠার সঙ্গে পড়া তৈরি করছে, অভিধানে প্রতিটি শব্দের মানে খুঁজছে এবং প্রচুর কষ্ট স্বীকার করছে। নিঃসন্দেহে তার এই সাধু সংকল্পের জন্যেই তাকে নিচের ক্লাসে আর নামতে হলো না, কারণ ব্যাকরণের নিয়মকানুন তার মোটামুটি জানা থাকলেও প্রকাশভঙ্গির সুষমা তার ছিল না বললেই চলে।’ (পৃ : ৩৭)

খ) ‘শার্ল তার নখপঙ্ক্তির শুভ্রতা দেখে বিস্মিত হলো। নখগুলি ছিল উজ্জ্বল চকচকে, অগ্রভাগ সুচারু, দিয়েপের গজদন্তের চেয়েও মার্জিত এবং বাদামের আকারে গোল করে ছাঁটা। অথচ তার হাত দুটি মোটেই সুন্দর নয়, যথেষ্ট শুভ্রও হয়ত নয় এবং অঙ্গুলিনলকের দিকে কিঞ্চিৎ শুষ্কও বটে, তদুপরি অত্যধিক দীর্ঘ, পরিলেখ রেখার পেলব নমনীয়তাবর্জিত। তার সমস্ত কিছুর মধ্যে সবচেয়ে যেটা সুন্দর সে হচ্ছে তার চোখদুটি; আসলে বাদামি হলেও চক্ষুপল্লবের কারণে মনে হতো কালো, আর তার দৃষ্টি অকপটে সাহসের সঙ্গে আপনার মুখের উপর নিবদ্ধ হতো।’ (পৃ : ৪৭)

গ) ‘বিয়ের আগে এম্মা ভেবেছিল জীবনে তার প্রেম এসেছে; কিন্তু এই প্রেমের হাত ধরে যে-সুখ আসার কথা ছিল তা এলো না দেখে সে ভাবল, নিশ্চয়ই সে ভুল করেছে। এবং সে জানতে চেষ্টা করল, বইয়ের পাতায় যে-শব্দগুলি তার কাছে এতো সুন্দর মনে হয়েছে- সুখ, প্রেমের উন্মাদনা, আনন্দোচ্ছ্বস-জীবনে সেগুলি বলতে আসলে কী বোঝায়!’ (পৃ : ৬৪)

ঘ) ‘পক্ষান্তরে, একজন পুরুষ মানুষের কি উচিত নয় সবকিছু জানা, বহুবিধ কর্মে পারদর্শিতা প্রমাণ করা, হৃদয়াবেগের তেজ, জীবনের পরিশীলিত রূপ ও সকল রহস্যের সঙ্গে তোমাকে পরিচিত করা? কিন্তু এই লোকটি কিছুই শেখাত না, কিছুই জানত না, কিছুই কামনা করত না।’ (পৃ : ৭২)

ঙ) ‘সন্ধ্যার ছায়া ঘনিয়ে আসছিল; অস্তাচলগামী সূর্য গাছের শাখা প্রশাখার মধ্য দিয়ে কিরণসম্পাতে ওর চোখ ঝলসে দিচ্ছিল। এখানে সেখানে, ওর চতুর্দিকে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে কিংবা মাটিতে অজ¯্র উজ্জ্বল দাগ ঝিলমিল করছিল, যেন কলিব্রি পাখিরা উড়তে উড়তে তাদের ঝরাপালকগুলি ছড়িয়ে রেখে গেছে। নিস্তদ্ধতা ছিল সর্বব্যাপী; গাছগুলির শরীর থেকে কী যেন একটা মাধুর্য নিসৃত হচ্ছিল; এম্মা অনুভব করতে পারছিল, তার হৃৎপি- আবার দ্রুততর গতিতে স্পন্দিত হচ্ছে, রুধিরধারা একনদী দুধের মতো, তার সারা শরীরে একটা অস্পষ্ট প্রলম্বিত চিৎকার, একটা একটানা মনুষ্যকণ্ঠ এবং নিস্তদ্ধ হয়ে সে শুনতে লাগল, যেন সেই স্বর তার উত্তেজিত স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে একটা সঙ্গীতের মতো মিশে যাচ্ছে।’ (পৃ : ১৮৪)

(সূত্র : স্বর্ণগর্দভ : লুসিয়াস-এপুলিয়াস, অনুবাদ : আবদুল গনি হাজারী, বাংলা একাডেমি, প্রথম প্রকাশ ১লা ডিসেম্বর ১৯৬৪; মাদাম বোভারি : গ্যুস্তাভ ফ্লোবের, অনুবাদ : জাহাঙ্গীর তারেক, প্রথম প্রকাশ জুন ১৯৯৭)

পাঁচ

আমার পড়া বিদেশি ছোটগল্পের মধ্যে যেসব লেখা মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে এখনও অব্যাহতভাবে আমাকে আলোক বিতরণ করে চলেছে এদের মধ্যে রয়েছে লিও টলস্টয়-এর ‘তিন প্রশ্ন’ (আমাদের পাঠ্যতালিকাভুক্ত ছিল), ‘এক টুকরো রুটি’, ‘মানুষের ভালোবাসা’, ‘কতটা জমি দরকার’সহ অসংখ্য জীবন-জিজ্ঞাসামূলক অমর গল্পসমূহ, আন্তোন চেকোভের ছোটগল্প ‘কেরানির মৃত্যু’, ‘লটারির টিকেট’, ‘বাজি’-এর মতো চমকপ্রদ সব ছোটগল্প; এডগার এলান পো-এর ছোটগল্প ‘দ্য ব্ল্যাক ক্যাট’, ‘দ্য গোল্ডেন বাগ’, ‘উইলিয়াম উইলসন’, ‘দ্য মাস্ক অব দ্য রেড ডেথ’, ‘দ্য ফল অব দ্য হাউজ অব আশার’-এর মতো শ্বাসরূদ্ধকর ছোটগল্প এবং আমার উচ্চমাধ্যমিকে পড়া অসাধারণ দুটি গল্প উইলিয়াম সমারসেট মম-এর ‘লাঞ্চন’ এবং ও হেনরির ‘দ্য গিফ্ট অব দ্য মেজাই’ অন্যতম। প্যাট্রিক হোয়াইট-এর বিখ্যাত ‘দ্য বান্র্ট ওয়ানস্’ (আমার বড় আপা হলিক্রস এর বইমেলা থেকে কিনে আমার জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলেন) বইয়ের সমাজদগ্ধ মানুষের জীবনচিত্রের বাস্তব কাহিনী সম্বলিত এগারটি ছোটগল্প পড়ে র-রিয়্যালিজমের শৈল্পিক অভিজ্ঞতা অর্জন করি। বিশ্বখ্যাত কানাডীয় লেখিকা এলিস মুনরো (যাঁকে বলা হয়ে থাকে “master of the contemporary short story”)-এর অসাধারণ গল্পগ্রন্থসমূহ যেমন ‘দ্য বিয়ার কেম ওভার দ্য মাউন্টেন’, ‘রানএ্যাওয়ে’, ‘প্যাশন’, ‘দ্য ভিউ ফ্রম ক্যাসল রক’, ‘ফেইস’ এবং ‘ফ্রি র‌্যাডিকেলস’ পড়ে মনে হয়েছে এগুলো যেন সাধারণ মানুষের মনোঃসমীক্ষণের নৈপুণ্য-ভাস্বর অনন্য দলিল। তিনি সময়াভাবে কেন উপন্যাস না লিখে ছোট ক্যানভাসে নিপুণভাবে মানবজীবনের ছবি বৃহত্তর সমাজের কাছে তুলে ধরতে ভালবাসেন তার উত্তর নিজেই দিয়েছেন এভাবে: Why do I like to write short stories? Well, I certainly didn’t intend to. I was going to write novel. And still! I still come up with ideas for novels. And I even start novels. But something happens to them. They break up. I look at what I really want to do with the material, and it never turns to be a novel. But when I was younger, it was simply a matter of expediency. I had small children, I didn’t have any help. Some of this was before the days of automatic washing machines, if you can actually believe it. There was no way I could get that kind of time. I couldn’t look ahead and say, this is going to take me a year, because I thought every moment something might happen that would take all time away from me. So I wrote in bits and pieces with a limited time expectation. Perhaps I got used to thinking of my material in terms of things that worked that ways. And then when I got a little more time, I started writing these older stories, which branch out a lot.”

ছয়

স্বভাষার পাশাপাশি বিদেশি কথাসাহিত্যের নিবিড় পাঠে মনোনিবেশ করে আমি প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছি আমার পাঠ-অভিজ্ঞতার ঝুলিকে যতটুকু সম্ভব সমৃদ্ধ করে তুলতে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই যে, জীবন-জীবিকার কর্ম-ব্যস্ততাজনিত সময়াভাব, অনুবাদের দূষ্প্রাপ্যতা এমনকি আর্থিক কারণেও বিশ্বখ্যাত অগণিত লেখকের বহু মূল্যবান রচনার অমৃতসুধা আস্বাদন করা অদ্যাবধি আমার পক্ষে সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গের সাথে অনেক লেখার যেমন মিল পেয়েছি আবার অমিলও প্রত্যক্ষ করেছি বিস্তর। তবে এসব মহৎ রচনাবলি পাঠ করে একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমার স্বল্পজ্ঞানের উপলব্ধি হলো- মানব-মানবীর দৈনন্দিন আনন্দ বেদনা, হাসি-কান্না, সুঃখ-দুঃখ, ভালোলাগা, প্রেম-ভালোবাসা-ঘৃণা, কামনা-বাসনা, বিরহ-বিচ্ছেদ, সংশয়-শঙ্কা, প্রলোভন-ঈর্ষাপরায়ণতাসহ যাবতীয় অনুভূতির প্রকাশ ও প্রতিক্রিয়াসমূহ সমাজ-দেশ-কাল নির্বিশেষে সার্বজনীন এবং তা বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের ভেতর দিয়ে পরিবেশ-পরিস্থিতি ও পাত্রভেদে নানারূপ পরিগ্রহ করে মাত্র।

আসলে সাহিত্য পাঠ বিশেষত বিদেশি সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রে প্রথম প্রথম মনে হবে যেন অচিন পরিবেশ পরিস্থিতি; এরপর এগুতে থাকলে মনে হয় বাক্যগুলো যেন একান্ত আপনার। এরই প্রতিধ্বনি পাই জেরেমি হথর্নের বক্তব্যে:

“The literary text seems like “A fortified medieval town-foreigners and outsiders are repelled, or allowed in only after rigorous checks, but within all is bustling life; exchange, mutual interdependence and influence are the rule.”

(সূত্র: ‘Jeremy Hawthorn, Unlocking The Text: Fundamental Issues in Literary Theory’)

  • নবনীতা দেবসেনের সঙ্গে একটি সন্ধ্যা

    আদনান সৈয়দ

    newsimage

    কপালে লাল টুকটুকে টিপ। মনে হচ্ছিল নিউইয়র্কের পড়ন্ত বিকেলের লাল সূর্যটা বুঝি ঠিক তাঁর কপালেই টুক করে জায়গা করে নিয়েছে। পরনে তাঁতের

  • লাতিন জাদুবাস্তবতার ওস্তাদ : হুয়ান রুলফো

    মোজাফ্ফর হোসেন

    newsimage

    একবিংশ শতকের প্রথমদিকে উরুগুয়ের নামকরা দৈনিক ঊষ চধল্পং ভোটিং-পোল খুলে দেশটির লেখক ও সমালোচকদের কাছে জানতে চায়, লাতিন

  • আমার আছে বই ১১

    মালেকা পারভীন

    newsimage

    ২০১৪ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ। ব্রাসেলস থেকে দ্য হেগ। দ্য হেগ থেকে আমস্টারডাম। সেবারের রোজার ঈদের ছুটির কয়টি দিন কিছু কারণে

  • ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনি : পাঁচ

    সিমলা-মানালির পথে

    কামরুল হাসান

    newsimage

    পানিপথে এসে বাস থামল, পুরাকালে যেভাবে থেমেছিল অশ্ব ও হাতি। এখানে পথ প্রশস্ত হয়েছে, সড়ক হয়েছে ছয় লেন, বসেছে রাজার

  • জাহিদ হায়দার-এর কবিতা

    newsimage

    আমার ছিন্নপত্র : ৭

  • উড়াল

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    বাংলাবাজারে ঢুকে শ্রীশ দাস লেনে মোড় নিলেই চোখে পড়বে বিউটি বোর্ডিং। এখানকার খানা দানা যে ভালো তা আগেই শুনেছিলেন আশরাফ