• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১

উত্তাপ

ফরিদা ইয়াসমিন সুমি

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর ২০১৯

image

ঘুম ভেঙে যায় বিথীর। দরদর করে ঘামছে। মনে হচ্ছে সারারাত ধরে স্বপ্ন দেখছিল। এরকমটা হয় মাঝেমাঝে। স্বপ্নের কথা মনে করে ভীষণ লজ্জা পায়। যেদিন থেকে মাসুদের আসবার কথা শুনেছে, সেদিন থেকেই এমন হচ্ছে। রোজ রাতে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। ঠিকমত ঘুম না হবার কারণে সারাদিন কোনো কাজেও মন বসাতে পারে না। মাথাটা ভার ভার লাগে। কেমন যেন একটা ঘুম ঘুম ভাব জড়ানো থাকে। মাথার কাছে থাকা ঢাকনা দেয়া গ্লাসের পানিটা ঢকঢক করে খেয়ে নেয়। ওড়না দিয়ে গলার ঘামটুকু মুছে। বাইরে সুন্দর বাতাস। জানালার পর্দাটা উড়ে উড়ে চাঁদের আলোটাকে ভেতরে আসবার জায়গা করে দিচ্ছে। বিছানায় আলো-আঁধারির অপূর্ব সমন্বয়। জানালার উল্টোপাশে ড্রেসিং টেবিলে নিজের ছায়াটা মায়াময় লাগে। দু’হাতে একে একে চোখ, নাক, মুখ, ঠোঁট, স্তন স্পর্শ করে। মৃদু চাপের সাথে চোখ বুঁজে আসে। তলপেটের কাছটাতে চিনচিনে অস্থিরতা, ব্যথা ব্যথা সুখানুভূতি। আর পারে না বিথী। পাশবালিশটা জাঁপটে ধরে আবার শুয়ে পড়ে। হাপরের মতো প্রবলবেগে ওঠানামা করছে বুকটা। হৃৎপিণ্ডটা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন। দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকল বিথী। শাওয়ারের নিচে দাঁড়াল। পা বেয়ে গরম গরম পানিতে ভেসে গেল মেঝে। গা মুছে খালি গায়ের উপর কলাপাতা রঙের ম্যাক্সিটা পরে নিল। ভেতরে কিছুই পরতে ইচ্ছে করছে না। বন্ধনহীন থাকুক আজ। পর্দাটা একপাশে সরিয়ে দিল। বিছানায় হুটোপুটি খাওয়া চাঁদের আলো জড়িয়ে ধরে লুটিয়ে পড়ল বিথী। এবার একটু ঘুমানো দরকার।

দুই

স্কুল ছুটির সময়টা খুব ভালো লাগে বিথীর। সব বাচ্চাগুলোকে দেখতে প্রায় একই রকম লাগে। প্রতিদিনই এই দৃশ্য দেখে। তবু যেন মুগ্ধতা কাটে না। পৃথিবীর সবচে’ সুন্দরতম দৃশ্যগুলোর একটি হচ্ছে বাচ্চাদের ছুটোছুটি। ছেলেটা এবার ক্লাস সিক্সে। আগামী বছর থেকে হয়ত আর নিতে আসতে হবে না। কত দ্রুত বড় হয়ে যায় বাচ্চারা। অথচ মনে হয়, এই তো সেদিন, সাদা টাওয়েলে জড়ানো ছোট্ট ছোট্ট হাত-পাওয়ালা একটা পুতুল বিথীর কোলে তুলে দিল নার্স। ঘন কালো চুলের ফাঁকে ছোট্ট ফর্সা মুখ। সবাই বলছিল, রাজপুত্রের মতো ছেলে হয়েছে। মেয়েটিও অনেক সুন্দর হয়েছিল। একদম ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ। বিথীর সাথে মিলিয়ে মেয়ের নাম রেখেছে যূথী। ছেলে জিহান যূথীর পাঁচ বছরের ছোট। এমনিতে ভাইবোনে খুব মিল। আবার ঝগড়া হলে একদম মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ। যূথীটা আগামী বছর এসএসসি দিবে। কিন্তু এখনও বাচ্চাদের মতো আচার-আচরণ। বিথীর অবশ্য ভালোই লাগে। ওদের মান অভিমান খুব উপভোগ করে। মেয়েকে কোচিং-এ নামিয়ে জিহানকে নিতে এসেছে। ক্লাসের প্রায় সবাই বেরিয়ে গেছে। জিহানকে দেখা যাচ্ছে না।

বাবার হাত ধরে গেটের দিকে আসছে তনিমা। জিহানের সাথেই পড়ে, একই সেকশনে। বিথীর উদ্বিগ্ন মুখ দেখে নিজেই এগিয়ে এসে কথা বললো, চিন্তার কিছু নেই ভাবী, জিহান ভেতরের মাঠে খেলছে। জোর করে একটু হাসলো বিথী। জিহানের ক্লাসের অনেক বাচ্চাদের বাবা-মা’র সাথেই পরিচয় আছে। তবে তনিমার বাবাটা কেন যেন সবসময়ই গায়ে পড়ে কথা বলেন। প্রথম প্রথম খুব বিরক্ত লাগতো। তবে ইদানীং মনে হয়, মানুষটা তেমন খারাপ না। আবার সব মহিলাদের সাথেই যে গায়ে পড়ে কথা বলেন তা-ও নয়। অনেকদিনের অবজারভেশনে দেখেছে বিথী, শুধু ওকে দেখলেই ভদ্রলোক কেমন যেন অস্থির হয়ে পড়েন। কোনো না কোনো উসিলায় কথা বলতে চান। একবার ভিজিটিং কার্ডও দিয়েছিলেন। হয়তোবা ওকে পছন্দ করেন। তা করতেই পারেন! কাউকে পছন্দ করা তো দোষের কিছু নয়।

কী আশ্চর্য! ভদ্রলোক এখনও ওর পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। একটু অস্বস্তি হতে লাগল। লোকটার চোখে যেন কী আছে। একদম ভেতরটাও দেখে ফেলে! বুকের আঁচলটা টেনে একটু ঠিকঠাক করে নিল বিথী। যুবতী নারীর স্বামী বিদেশে থাকলে অনেক ধরনের চোখ এবং চাহনীর মুখোমুখি হতে হয়। বিথীরও অভিজ্ঞতা আছে ঢের। যাক! বাঁচা গেলো। জিহান আসছে। বিথী এগিয়ে গিয়ে জিহানের হাত ধরতেই পিছু ফিরে দেখল, ভদ্রলোক চলে যাচ্ছেন।

তিন

দুপুরে খাইয়ে অনেকটা জোর করেই ঘুম পাড়ায় জিহানকে। নইলে রাতে একদম পড়তে পারে না। পড়ার টেবিলে বসেই ঘুমে ঢুলতে থাকে। এ সময়টায় যূথী কোচিং-এ থাকে। ইংলিশের জন্য বাসায় রায়হান টিচার আছে। বিজ্ঞানের সাবজেক্টগুলো স্কুলের টিচারদের কাছে ব্যাচে পড়ে। বাসার টিচারটিও ভালো। যূথীর সাথে জিহানকেও পড়ায়। অনেকদিন ধরে পড়াচ্ছে বলে বাসার সদস্যের মতোই হয়ে গেছে। মাঝেমাঝে ওকে দিয়ে টুকটাক কাজ করায়। ভালোমন্দ কিছু রান্না হলে না খাইয়ে ছাড়ে না বিথী। স্বামী ছাড়া ছেলেমেয়ে নিয়ে শহরে থাকা একটি মেয়ের জন্য নিতান্ত সহজ ব্যাপার নয়। সুপারশপগুলো হওয়াতে তবু রক্ষা। বাজারের চিন্তাটা অন্তত করতে হয় না। তারপরেও প্রবাসীদের স্ত্রীদের অনেক ধরনের কষ্ট। হুমম, কষ্টটা অনেক ধরনের বটে!

এরকম একলা সময়গুলো কাটতে চায় না। ভাদ্রের দুপুরে মাটি তেতে ওঠে ধোঁয়ার মতো হলকা ছড়ায়। গরমে যেন সিদ্ধ হবার জোগাড়। এক ফোঁটা বাতাসও নেই। প্রকৃতিও যেন দম ধরে আছে। এবার মাসুদ এলে এসি লাগিয়ে দেবার কথা বলবে। কবে আসবে মাসুদ। কোনো ধরনের গরমই আর সহ্য হয় না বিথীর। অস্থির লাগছে। দেখতে দেখতে চোখের সামনে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামে। হঠাৎই চমকে দিয়ে মোবাইল বেজে ওঠে। সচরাচর এ সময়ে ফোন খুব একটা আসে না। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই একইসঙ্গে আনন্দ আর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল বিথীর চোখেমুখে। মাসুদের ফোন। রিসিভ করতেই মাসুদের কণ্ঠস্বর। ‘ভিডিও কল দাও নি কেন?’ একটু অভিমানী-স্বরেই বলে বিথী। মাসুদকে খুব ¤্রয়িমাণ শোনায়। ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে বিথীর কান। পাশের সোফায় ধপ করে বসে পড়ে। মাসুদের কথাগুলো অনেক দূর থেকে ভেসে আসতে থাকে। প্রথমবার যখন প্রসব-ব্যথা উঠেছিল, চারপাশের মুখগুলো ঝাপসা হয়ে দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। সবার কথাগুলোও সুদূর থেকে এসে ভেঙে ভেঙে আছড়ে পড়ছিল। পাড় ভাঙা ঢেউয়ের অশুভ গর্জনের মতো। কেমন যেন একটা ঘোর-লাগা ভাব! সব কথা কান পর্যন্ত পৌঁছুতে পারছিল না। তার আগেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিল। বুদ্বুদের মতো। অনেকদিন বাদে আবার সেই অনুভূতি!

মাসুদ আসছে না। ক্যানসেল হয়েছে। অনেক ব্যাখ্যা অনেক অসহায়ত্ব অনেক বেদনা, অনেক সোহাগ ছিল, যেগুলো বিথীর কান পর্যন্ত পৌঁছায় নি। এর আগেও লম্বা সময় পরে মাসুদ দেশে এসেছে। এবার যেন অস্থিরতা একটু বেশিই ছিল। গলাটা শুকিয়ে আসে। অন্ধকারে হারিয়ে যেতে থাকে বিথী। শরতের আকাশও হঠাৎ মেঘলা হয়ে আসে। কণা কণা বৃষ্টি ঝরতে শুরু করেছে। বরফকুচির মতো। বারান্দার কাপড়্গুলো তুলে ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে তাকায়। বেচারা বাবাকে দেখে না কতদিন! স্মৃতি থেকে বাবার আদর হয়তো মুছেই গেছে। মেয়েটাও বড়ো হচ্ছে। এসময় ওদেরই বাবাকে বেশি প্রয়োজন।

চার

এবার এলে কিছুতেই যেতে দিবে না মাসুদকে। চোখ-মুখ শক্ত দেখায় বিথীর। দুজনে মিলে চাকরি করবে। প্রয়োজনে কিছু স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিবে। প্রতিবারই এরকম প্ল্যান করা হয়। কিন্তু কখনই আর বাস্তবায়ন হয় না। দারিদ্র্য বিরাট অভিশাপ। বিথীর চোখে পানি আসে। আসলে নিরুপায় হয়েই মাসুদ বারবার ফিরে যায়। বোঝে ও। পরিবারের বড় ছেলে। পড়ালেখায় ভালোই ছিল। কষ্টে জর্জরিত হয়েও পড়াশোনা বন্ধ করতে দেয়নি বাবা-মা। খেয়ে না খেয়ে ভার্সিটি থেকে অনার্সসহ মাস্টার্স শেষ করে। এরপর শুরু হয় চাকরি খোঁজার যুদ্ধ। বিয়ের পর বিস্মিত হয়ে মাসুদের জীবনের এসব গল্প শুনত বিথী। স্টলে দাঁড়িয়ে পত্রিকার প্রতিটি পাতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে। প্রতিটি বিজ্ঞাপনে আবেদনপত্র পাঠায়। প্রাইভেট কোম্পানিগুলোতে পায়ে হেঁটে গিয়ে চাকরির সন্ধান করে। আশায় আশায় বাবা-মা’র চোখের আলো স্তিমিত হয়ে আসে। কী করে বোঝায় তাদের, সফলভাবে পড়ালেখা শেষ করা চাকরি প্রাপ্তির জন্য তেমন কোনো যোগ্যতা নয়! বিভিন্ন কম্পিউটার ল্যাবে পার্টটাইম জব আর টিউশনি করে কাটে মাসুদের। বাড়িতে ছোট দুই ভাই, দু’জন অবিবাহিত বোন। চোখেমুখে অন্ধকার দেখে মাসুদ। ঠিক এসময়েই বিথীর সৌদি প্রবাসী বড়ভাইয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ হয় বর্তমানের কফিলের সাথে। মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েই বুঝতে পারে, বেশ বড় রকমের একটা গোলকধাঁধায় আটকে পড়েছে মাসুদ। এ এক চক্রের মতো। এ থেকে বেরুবার পথ নেই। মুক্তি নেই। কতবার যে মাসুদ ভেবেছে সব ছেড়েছুড়ে দেশে চলে আসবে। বাবা-মা’র অসহায় মুখ আর ভাই-বোনদের কথা ভেবে আবার মন দিত কাজে। দেশের জন্য, বিথীর জন্য মন কাঁদত। কিচ্ছু করার নেই! অল্পকিছু ব্যতিক্রম বাদে আরবের প্রকৃতির মতো এর বেশিরভাগ লোকেরাই বড়ো নিষ্ঠুর। অন্তরে মায়াদয়া বলে কিছু নেই। ভীষণ রকমের বে-রহম তারা। পান থেকে চুন খসলেই বেতন কেটে রাখে। ছুটিতে বাড়ি গেলে প্রাপ্য টাকাটা কখনওই পুরোটা পরিশোধ করে না। কিছু টাকা সবসময়ই হাতে রেখে দেয়। এই টাকার লোভেই আবার ফিরতে বাধ্য হয় অনেকেই। হায়রে দারিদ্র্য! এর মধ্যেও কিছু মানুষ তবু স্বপ্ন দেখে চিরতরে দেশে ফেরার। মাসুদও তাদের একজন ।

পাঁচ

মাসুদ আর বিথীর বড়ভাই একই কোম্পানিতে চাকরি করে। এই মালিক অবশ্য অনেকের চেয়ে তুলনামূলক ভালো। গত দশ বছরে দুটো বোনের বিয়ে দিয়েছে। ভাঙাচোরা বাড়িটা নতুন করে গড়েছে। ভাই দুজনের পড়াশোনাও বন্ধ করতে হয় নি। ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য ছেলেমেয়েসহ বিথীকে আলাদা বাসা করে দিয়েছে। বিয়ের তিন মাসের মাথায় দেশ ছাড়ে মাসুদ। বিথী তখন মাত্র দেড় মাসের সন্তানসম্ভবা। জন্মের পর ভিডিওতে মেয়েকে প্রথম দেখে। প্রথমবার পাঁচ বছরের আগে ছুটিতে যাবার অনুমতি পায় নি। দ্বিতীয়বারও বিথীকে সন্তানসম্ভবা রেখে আসে মাসুদ। ছেলের জন্মের পর অবশ্য বহু কষ্টে মালিককে রাজি করিয়ে তিন বছর পরেই ছুটিতে গিয়েছিল। ছেলেমেয়েকে রেখে ফিরে যেতে খুব কষ্ট হয়। কথা দিয়েছিল, এখন থেকে প্রতি তিন বছর পরপরই আসবে। ওদের মুখটা মনে করে করে চাকরিতে গতি আনার চেষ্টা করে। একটি টাকাও উল্টোপাল্টা খরচ করে না। সপ্তাহান্তে অনেকেই নানান বিনোদনের খোঁজে বেরুতো। কেউ মুভি দেখত, তাস খেলত। কেউবা নির্ধারিত কিছু ব্রোথেলে যেত দেহমনের ভার হালকা করতে। মাসুদের তখন সময় কাটত বউ, ছেলেমেয়ের সাথে ভিডিও কনফারেন্সে। দু’একবার যে সে সব জায়গায় মাসুদ যায়নি তা নয়। খুব ঠেকায় পড়ে দু’বার গিয়েছিল। কিন্তু শুধুমাত্র শারীরিক প্রয়োজনে ওসব জায়গায় যেতে মন কখনই তেমন সাড়া দেয়নি। বিথীর মুখটা ভেবে অপরাধবোধও হয়েছে। বড়ো বেশি শরীর ওখানে। মন একদম নেই। সেজন্যেই যাওয়া হয়ে ওঠেনি আর!

হাতে কিছু টাকা জমলেই একেবারে দেশে ফিরে যাবে। ছোটোখাটো কোনো ব্যবসা করবে। জানে না, সে পরিমাণ টাকা ওর কবে জমবে!

ছয়

এখনও স্বাভাবিক হতে পারে নি বিথী। কান্নাও যেন শুকিয়ে গেছে। মাসুদের আসা এক বছর পিছিয়ে গেছে। আসবে শুনে কতো প্রস্তুতি নিয়েছিল! ঘরদোর গুছিয়ে ঝকঝকে করেছে। হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে পার্লারেও গিয়েছিল। মাসুদের জন্য খুব সুন্দর একটা আড়ং-এর পাঞ্জাবি কিনেছে। উদভ্রান্তের মতো লাগছে নিজেকে। চারপাশটা ভয়ানক মেঘলা হয়ে আসছে। কোথাও সম্ভবত নিম্নচাপ হয়েছে। একটু আগের কণা কণা বরফকুচির বৃষ্টিটাই এখন প্রবলবেগে ঝরছে।

এমনই এক বৃষ্টির দিনে মাসুদ আর বিথী আনোয়ারার শঙ্খ নদীর ঘাট থেকে সাম্পানে চড়েছিল। বিয়ের প্রথম মাসে। তখনও বিথীর জড়তা পুরোপুরি কাটে নি। একটা পুঁটুলির মতো জড়সড় হয়ে বসেছিল পাটাতনে। কানের কাছে মুখ এনে কী সব কৌতুক যে বলছিল মাসুদ! লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছিল বিথী। মাসুদের বেহায়াপনায় উস্কানি পেয়ে সাম্পানের মাঝি চটুল গান ধরেছিল। ঝুম বৃষ্টিতে মাঝ নদীতে চট্টগ্রামের গান শুনতে কী যে ভালো লাগছিল! সচরাচর আঞ্চলিক গানগুলো যেমনটা হয় এটাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। কেবল আঞ্চলিক গানই পারে কোনো আড়াল না রেখে সরাসরি যৌবন বা শরীরী উন্মাদনার কথা শ্রুতিমধুর করে প্রকাশ করতে। বৃষ্টিও যেন তাদের সম্পর্কের উত্তাপ টের পেয়ে লাগামহীন ঝরছিল সেদিন। শঙ্খ নদীটা খুব মজার। এর এক পাড়ে আনোয়ারা আর অন্য পাড়ে বাঁশখালী। এই দুই অঞ্চলের মধ্যে আত্মীয়তাও তাই বেশি। মাধ্যম হিসেবে থাকে সেতুর মতো বয়ে চলা নদী। মাসুদটা এতো দুষ্টু! মাঝিভাই একটু এদিকওদিক ফিরতেই চুমু খাচ্ছিল বিথীর চোখেমুখে! সে রাতে আর ঘুমুতে পারে নি ওরা কেউ! প্রেম আর খুনসুটিতে জেগে ছিল সারারাত।

দমবন্ধভাব হতে লাগল বিথীর! মনে হলো, এক বছর কেন, এক ঘণ্টাও বুঝি আর কাটবে না মাসুদকে ছাড়া! বৃষ্টির জন্যেই বোধহয় জিহানের ঘুমটা আরও গাঢ় হয়েছে। মাঝে একবার গিয়ে গায়ের চাদরটা টেনে দিয়েছে।

চারপাশ আঁধার করে এসেছে। ইলেকট্রিসিটিও চলে গ্লে। অন্ধকারেই বসে রইল বিথী। আলো জ্বালতে ইচ্ছে করছে না। কেউ বোধহয় কড়া নাড়ছে। অনেকক্ষণ ধরেই বোধহয় নাড়ছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে গিয়ে দরজা খুলল বিথী।

রায়হান এসেছে। পড়াতে। ভিজে সপসপে হয়ে গেছে ছেলেটা। দরজা খোলাতে ঘরের ভেতরকার অন্ধকারটা আরো বেশি গাঢ় মনে হলো। জিহানটা ঘুমোচ্ছে। যূথীও কোচিং থেকে ফেরেনি। বৃষ্টির কারণেই বোধহয় দেরি হচ্ছে। এরকম বৃষ্টিতে রিক্সা, ট্যাক্সি কিছুই পাওয়ার কথা না। কখন যে পাঁচটা বেজে গেছে টের পায়নি বিথী। পড়তে বসার সময় হয়ে গেছে। আবহাওয়ার কারণে বিকেলবেলাতেই নেমেছে গভীর রাত। আজ ওরা পড়তে না চাইলে জোর করবে না বিথী। মানিব্যাগ থেকে ইলেকট্রিক বিলের কাগজটা এগিয়ে দিল রায়হান। একটু ভেজাভেজা। হঠাৎ খেয়াল হলো বিথীর। মাথাটা আসলে একদম কাজ করছে না। ইশ! রায়হানকে যে একটা তোয়ালে দিবে তা-ও ভুলে গেছে। দৌড়ে গিয়ে তোয়ালে নিয়ে এলো। এই ফাঁকে রায়হান পকেটে থাকা ভেজা দিয়াশলাইটা জ্বালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ওহ হো! আলোও তো জ্বালানো দরকার! চার্জলাইটটা নষ্ট হয়ে গেছে। মোমবাতিগুলো যে কোথায় রেখেছে বুয়া! এমন অসময়ের বৃষ্টিতে প্রস্তুতি থাকে না কিছুরই! তোয়ালেটা এগিয়ে দিতেই রায়হানের ভেজা হাতে হাত লেগে যায় বিথীর। ঘনঘোর বর্ষাতেও ভেতরকার উত্তাপটুকু টের পায় গভীরভাবে।

হচ্ছেটা কী! কী হচ্ছে এসব! কী হয়েছে বিথীর! সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়! দু’পাড় আছড়ে ঢেউ ভাঙে যেনবা! আর পারবে না! কিছুতেই না! আজ আর কিছুতেই পারবে না বিথী!

‘কী হয়েছে, ভাবী? তোমার শরীর খারাপ?’ বিথীর মুখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল রায়হান।

জানি না রায়হান, আমি কিছুই জানি না! আমাকে ছেড়ে যেও না প্লিজ! কাছে এসো!

অপরিবর্তনীয়, অলঙ্ঘ্যনীয়, অমোঘ এক নির্দেশনার মতো বিথীকে অনুসরণ করে চলে রায়হান।

দূরে কোথাও বুঝি বাজ পড়ল প্রচণ্ড শব্দে!

  • সিলভিয়া প্লাথ

    মৃত্যু, নৈঃসঙ্গ্য ও আত্মবিনাশের কবি

    কামরুল ইসলাম

    newsimage

    সিলভিয়া প্লাথ ছিলেন আমেরিকান কনফেশনাল কবিদের অন্যতম। সাহিত্যে কনফেশন বলতে বোঝায় সেই আত্মজীবনীমূলক রচনা (প্রকৃত

  • জীবন প্রলয়ী সিলভিয়া প্লাথ

    মিলটন রহমান

    newsimage

    আমার অন্তর্গত অনুসন্ধান এবং পর্যবেক্ষণিক সিলভিয়া প্লাথের বয়স বাইশ বছরের কম নয়। প্রথমদিকে কাব্যের চেয়েও বেশি অনুরক্ত এবং

  • সিলভিয়া প্লাথের কবিতা

    অনুবাদ : অশোক কর

    দু’জন, নিঃসন্দেহে ওরা দু’জনই। এখন খুবই স্বাভাবিক বলেই মনে হয়Ñ একজন

  • কমলকুমার বিষয়ে ভাব প্রকাশ

    মামুন হুসাইন

    newsimage

    কৃতি সমালোচকের বাক্য নকল করে বলি- লেখা তার ঈশ্বর সাধনা; নাকি বলবো পুরাণ, ব্রতকথা, ধ্রুপদী সঙ্গীত, মন্দির ভাস্কর্যের

  • ফিরে যাব রাজপথে

    সৌর শাইন

    newsimage

    মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি জীবননাশী দূতকে, যদিও চোখ দুটো বাঁধা। মৃত্যু আমার নিচের ঠোঁটটা আলতো ছুঁয়ে গেল।

  • সাময়িকী কবিতা

    নোরা টোরভাল্ডের প্রাণ বাঁচিয়েছে। মিস লিন্ডে মৃত্যুশয্যাশায়ী মার পাশে ছিল, তার