• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৭ কার্তিক ১৪২৬, ১৪ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

আমার আছে বই (১০)

মালেকা পারভীন

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

image

অফিসের কাজের চাপে যখন দিনের পর দিন সাহিত্যের পাতাগুলো পড়া হয় না, তখন সেগুলো বেশ মন ভার করে জমতে থাকে। একটার পর একটা। যতগুলো আমি সংগ্রহ করে রাখি নিজের পছন্দে। তারপর একসময় ঠিকই আমাকে সময় বের করে নিতে হয়। অনেকগুলো পত্রিকার সাহিত্য পাতা, সাময়িকী নিয়ে আমি বসে যাই। হয়তো এক ছুটির দিনের যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাজ সেরে।

সাহিত্যচর্চা এখনো যেহেতু জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের মতো অপরিহার্য বিষয় হয়ে ওঠেনি, তাই। সাহিত্যের প্রতি অপ্রতিরোধ্য ভালোবাসা এখনো কেবল প্রিয় অবসর যাপনের অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয় বলে। সাহিত্য করে পেট চলে না, দেশ-জাতি উদ্ধার হয় নাÑ এখনো এমন অমোঘ তিক্ত বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে হয় বলে। যদিও বিশ্বাস করতে চাই, হয়তো একদিন এমন অবাস্তব অকেজো অমানবিক ধারণার পরিবর্তন হবে। হয়তো সেই কাক্সিক্ষত পরিবর্তন স্বচক্ষে দেখবার জন্য সেদিন থাকবো না এই অদ্ভুত সুন্দর পৃথিবীর পাঠশালায়।

আবার কোনোদিন অফিস থেকে ক্লান্ত শরীরে ফিরে দিন শেষে যতখানি সজীব হয়ে ওঠা সম্ভব ততটুকু সজীবতা সংগ্রহ করে নিয়ে এসব জমিয়ে রাখা সাহিত্যের কাগজ হাতে করে বসে পড়ি। আজ যেভাবেই হোক সব পড়ে শেষ করতে হবে এই ধনুর্ভাঙা পণ নিয়ে।

দুদিন আগে এমন কিছু জমিয়ে রাখা পড়ার সামগ্রীর প্রতি সুবিচার করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করলাম। এর মধ্যে অফিস বদল হয়েছে বলে এতোদিন যে কাগজগুলো যা হোক অফিসেই রাখতে পেরেছিলাম, এখন সেগুলো বাড়ি বয়ে আনতে হয়েছে। নতুন যে কর্মস্থলে যাবো, সেখানে এগুলোর স্থান সংকুলান হবে কিনা কে জানে।

বেছে বেছে পড়তে শুরু করলাম। একটা খবরে চোখ আটকে গেলো। অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগেও বই নিষিদ্ধ করবার মতো অস্বাভাবিক ঘটনার পেছনে সত্যিই কোনো কারণ খুঁজে পাই না। ছোট্ট খবরটার শিরোনামই এমন যে আরেকটু বিস্তারিত জানবার জন্য উৎসুক হই। খবরটা গত বছরের (২০১৮) নভেম্বরের। ৪৩তম কুয়েত আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে প্রায় ১০০০টি নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকায় দস্তয়েভস্কির বিখ্যাত ‘ব্রাদার্স কারামাজভ’ বইটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, দস্তয়েভস্কির এই মাস্টারপিস সাহিত্যকর্মে ঊনবিংশ শতাব্দির রাশান সমাজে বিদ্যমান নৈতিকতা, স্বাধীন ইচ্ছা, ¯্রষ্টার অস্তিত্ব-এর মতো বিষয়গুলি উঠে এসেছে।

গত পাঁচ বছরে কুয়েতের তথ্য মন্ত্রণালয় যে ৪০০০-এর বেশি বই বিভিন্ন কারণে কালো তালিকাভুক্ত করেছে, তার মধ্যে ভিক্টর হুগোর ‘দ্য হানচব্যাক অভ নটরডাম’ এবং মার্কেজের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’ও জায়গা করে নিয়েছে। অবাক করবার মতো বিষয় হচ্ছে, সত্তর এবং আশির দশকে এই কুয়েত ছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্রকাশনা জগতের কেন্দ্রবিন্দু; বিখ্যাত প্যান-আরব সংস্কৃতি বিষয়ক জার্নাল ‘আল-আরাবি’সহ অনেক জনপ্রিয় বিজ্ঞান-ভিত্তিক ও সাহিত্যিক বইয়ের উৎসস্থল। অথচ, গত কয়েক বছরে পার্লামেন্টে ধার্মিক রক্ষণশীল এবং গোত্রীয় নেতাদের প্রাধান্যের কারণে মিডিয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার বাড়াবাড়ি চলছে। কিছু কিছু প্রতিবাদের পাশাপাশি।

খবরটি সাহিত্যমনাদের জন্য মন খারাপের। আমিও কষ্ট পেলাম চিরন্তন বিশ্বসাহিত্যের রস আস্বাদনের পথে এসব অর্থহীন প্রতিবন্ধকতার অযাচিত আরোপে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় প্রার্থনা করে এ প্রসঙ্গের ইতি টানছি।

কিন্তু, মনের খচখচানি শান্তি দেয় না অনেকটা সময় ধরে। মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে এমন অবিবেচনাপ্রসূত নজরদারি বা জোর-জবরদস্তি যে হিতে বিপরীত হয়Ñ এটি কেন সংশ্লিষ্টদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না; বিষয়টি আমার মতো নিরীহ পাঠকের বোধগম্য হয় না কিছুতেই। সমস্যাটি প্রাচীন। কিন্তু সভ্যতার যত উন্নতি ঘটেছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে এমন নিষিদ্ধকরণের প্রক্রিয়া তত সূক্ষ্ম ও জটিল হয়েছে। ফলত মানুষের মধ্যে বেড়েছে পরমত অসহিষ্ণুতার মতো ক্ষতিকর প্রবণতাÑ যা পরস্পরের মধ্যে শুধু অশ্রদ্ধা আর অবহেলাকে বৃদ্ধি করে চলেছে। সারা দুনিয়ার একই চিত্র। আমরা যে কোথাও একসাথে বসে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমস্যার সমাধান করবো, সেই মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া ক্রমশ অপসৃয়মাণ। অন্যের কথা শুনবো না, কেবল নিজের কথা বলে যাবো। তাই কি হয়? যাক, ছোট্ট একটি সংবাদও কত গূঢ় চিন্তার সূত্রপাত ঘটায়, যুগ যুগ ধরে জিইয়ে রাখা সমস্যাগুলি নিয়ে আবারও ভাবতে বাধ্য করে।

এরপর যে খবরটি পড়লাম, তা আমাকে আরো একবার ফরাসি সাহিত্য নিয়ে খানিকটা নাড়াচাড়া করবার জন্য উৎসাহ জোগালো। ‘লে ফ্লুর দু মাল’ বা ‘বেদনার পুষ্পরাজি’ নামের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের জনক বিখ্যাত ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার ২৪ বছর বয়সে একবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। আর্থিক দেনা এবং নিজের সাহিত্যিক প্রতিভা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই ভয়ঙ্কর অভিপ্রায় ব্যক্ত করে তাঁর তৎকালীন প্রেমিকা জীন দুভালকে উদ্দেশ্য করে তিনি একটি চিঠিও লেখেন। ১৮৪৫ সালের ৩০ জুন তারিখে চিঠিটি লেখার দিনে কবি আত্মহত্যার চেষ্টা করলেও তাতে সফল হননি। এরপরও প্রায় ২২ বছর তিনি বেঁচেছিলেন এবং পাঠকদেরকে তাঁর কাব্য-প্রতিভার চমক দিয়ে ধন্য করেছেন।

ফরাসি নিলাম প্রতিষ্ঠান ওসেনাত আত্মহত্যার ইচ্ছা ব্যক্ত করে কবির স্বহস্তে লেখা ‘অসাধারণ’ চিঠিটির সম্ভাব্য বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করেছিল ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার ইউরোর মধ্যে। তবে বোদলেয়ারের চমক লাগানো কবিতার মতো তাঁর চিঠিটিও নিলামে প্রায় তিন গুণ মূল্যে বিক্রি হয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিস্মিত করে দেয়। গত বছরের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একজন ব্যক্তিগত সংগ্রাহক ২ লাখ ৩৪ হাজার ইউরো দিয়ে চিঠিটি সংগ্রহ করে নেন।

চিঠিটিতে বোদলেয়ার কী লিখেছিলেন সে প্রসঙ্গে না গিয়ে আমি বরং অত্যন্ত দুঃখের সাথে ভাবছি, চিঠি লেখার দিন মনে হয় ইতিমধ্যে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে! নিজের হাতে শেষ কবে চিঠি লিখেছি সেটিই তো স্মরণে নেই। অন্যের কথা কীভাবে লিখবো। কাজে-অকাজে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিস্তর ইমেইল লেখা হয়, মোবাইলে টেক্সট মেসেজ পাঠানো হয়, ফেসবুকের ইনবক্সে কদাচিৎ লিখে লিখে চ্যাটিংও করা হয়।কিন্তু এগুলোর একটিতেও থাকে না প্রাণের আবেদন, হৃদয়ের আকুতি বা মনের নির্যাস। হাতেগোনা ব্যতিক্রম ছাড়া এগুলির কোনটিরই কোন ঐতিহাসিক বা সাহিত্যিক মূল্যও থাকে না। অথচ, একসময় চিঠি লেখাটাই ছিল নিজ গুণে একটি আলাদা শিল্প। চিঠির আকারেই পৃথিবীর নানা প্রান্তে লেখা হয়ে গেছে কত জনপ্রিয় কথাসাহিত্য। ‘এপিস্টোলারি’ উপন্যাস বা পত্রোপন্যাস নামে বিশ্বসাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি হয়ে গিয়েছিল যেখানে চিঠি ছিল মূল সঞ্চালকের ভূমিকায়। অষ্টাদশ শতকের ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক স্যামুয়েল রিচার্ডসনকে এ ঘরানার পথিকৃৎ ধরা হয়। এ ধারায় তিনি তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাস ‘পামেলা’ রচনা করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষায় আরো অনেকে এ জাতীয় উপন্যাস লিখেছেন। বাংলা ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধদেব গুহ-এর ‘সবিনয় নিবেদন’ এ ধারায় লেখা একটি পাঠকপ্রিয় উপন্যাস।

যা হোক, চিঠির কথা বলতে গিয়ে আরো একটি ছোট্ট সাহিত্য সংবাদের প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। স্বাভাবিকভাবে। এটিও একজন বিখ্যাত লেখকের লেখা চিঠিÑ যেটি গত বছরের নভেম্বরে এক নিলামে ২৮ হাজার ডলার মূল্যে বিক্রি হয়েছে। চিঠিটি আর কেউ নয়, স্বয়ং হেমিংওয়ে লিখেছিলেন ১৯৩৫ সালের ৮ মে তারিখে ‘মিয়ামি হেরাল্ড’ পত্রিকার মৎস্য সম্পাদকের কাছে। চিঠির বিষয়বস্তু লেখকের একটি বিশেষ মাছ ধরবার দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতা। চিঠিতে হেমিংওয়ে সবিস্তারে লিখেছিলেন, কীভাবে তিনি এবং তাঁর বন্ধু হেনরি স্ট্রেটারকে বিশাল ওজনের ব্লু মার্লিন মাছটিকে তীরে আনবার পথে অসংখ্য শার্কের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। মাছটিকে তাঁরা বিমিনির বাহামা দ্বীপে শিকার করেছিলেন। লেখকের কথায়, অতিকায় আকারের মার্লিন মাছটিকে শার্কগুলো কামড়ে খেয়ে না ফেললে হয়তো এটির ওজন হতো ৭০০ থেকে ৯০০ পাউন্ড। কিন্তু শার্কগুলোর তীব্র আক্রমণ বাঁচিয়ে যখন এটিকে তীরে এনে ২০ জন দর্শকের সামনে মাপা হলো, দেখা গেলো এটির ওজন কমে দাঁড়িয়েছে ৫০০ পাউন্ডে।

অনুমান করা যায়, এ মৎস্য অভিযানের অভিজ্ঞতাকে মূল ঘটনা ধরে পাপা তাঁর জগতবিখ্যাত ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’ উপন্যাসের কাহিনী নির্মাণ করেছিলেন। নিলাম কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, উল্লিখিত চিঠি থেকে প্রথমবারের মতো হেমিংওয়ের নিজের বর্ণনায় দৈত্যাকার মাছটির ওজন সম্পর্কে শুধু নয়, একই সাথে শার্কের আক্রমণের বিষয়েও জানতে পারা যায়। এই সত্য ঘটনাগুলো পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসের প্লটের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে যেখানে লেখক অদ্ভুত মুন্সিয়ানায় বৃদ্ধ কিউবান জেলে সান্তিয়াগোর মধ্য দিয়ে নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার চিত্র ফুটিয়ে তোলেন। আর আমরা, বিমুগ্ধ পাঠকরা, বিশাল সমুদ্র বক্ষে কেবল একটি মাছ শিকারের অভিযানের রূপকে লাভ করি কঠিন জীবন-সংগ্রামে বেঁচে থাকবার মহা মূল্যবান শিক্ষা: “মানুষকে ধ্বংস করা যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না।”

হেমিংওয়ের মাছ শিকারের ঘটনাটি আংশিকভাবে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস রচনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে মনে করা হলেও এ বিষয়ে অনুরূপ আরো একটি গল্পের কথা শোনা যায়। গল্পটি লেখকের কিউবান বন্ধু কার্লোস গুতিয়েরেজ বলেছিলেন। ‘এসকোয়ার’ পত্রিকার ১৯৩৬ সালের এপ্রিল সংখ্যায় হেমিংওয়ে লিখেছিলেন, সমুদ্র তীরে অবস্থিত ঘরের বাইরে একাকী একটি ছোট নৌকায় মাছ ধরার সময় একজন বৃদ্ধ বিরাট আকারের এক মার্লিন তাঁর হাতের শক্ত বড়শিতে গেঁথে ফেলেন যেটি তাঁর নৌকাটিকে টেনে সমুদ্রে নিয়ে যায়। দুদিন পরে পুব দিকে ৬০ মাইল দূর থেকে জেলেরা যখন বৃদ্ধকে উদ্ধার করে, মার্লিনটির মাথা ও সামনের অংশ ছাড়া তার শরীরে অর্ধেকেরও কম যা ছিল তার ওজনও ছিল প্রায় ৮০০ পাউন্ডের মতো। বৃদ্ধ মাছটির সাথে দুই দিন, দুই রাত কাটিয়ে দেন যখন এটি সাঁতরে গভীর সমুদ্রে চলে যায় আর সাথে বৃদ্ধের নৌকাটিকেও টেনে নিয়ে যায়। পরে কোন একসময় মাছটি পানির ওপর ভেসে উঠলে বৃদ্ধ নৌকাটিকে এর শরীরের ওপর তুলে ফেলেন এবং মাছটিকে হারপুন বিদ্ধ করেন। এ সময় অসংখ্য শার্ক নৌকার পাশ থেকে তাঁকে আক্রমণ করতে থাকলে বৃদ্ধ একা একা তাদের সাথে তুমুল লড়াই করতে থাকেন। শার্কগুলোকে তিনি আঘাত করতে থাকেন, ছুরি মারতে থাকেন আর হাতের বইঠা দিয়ে বাড়ি দিতে থাকেন যতক্ষণ না ক্লান্তিতে তিনি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন এবং শিকারী শার্কগুলো মার্লিনটির শরীর থেকে যতখানি পারা যায় খুবলে খেয়ে ফেলে। এমন একটি শিকার হারিয়ে ফেলার ক্ষতিতে বৃদ্ধ নৌকার ভেতরে বসে অসহায়ের মতো কাঁদছিলেন যখন জেলেরা তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। সে সময়ও হিং¯্র শার্কগুলো তাঁর নৌকার চারপাশে বৃত্তাকারে ঘুরছিল।

এর তিন বছর পর হেমিংওয়ে তাঁর সম্পাদক ম্যাক্স পারকিন্সকে জানান যে তিনি একটি ছোটগল্পের বইয়ের পরিকল্পনা করছেন যার একটি হবে সেই বৃদ্ধ জেলেকে নিয়ে যিনি একা হাতে একটি সোর্ড ফিশের সাথে লড়াই করেছিলেন। এ বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তিনি তাঁর বন্ধু কার্লোসকে নিয়ে একই ধরনের অভিযানে যাওয়ার ইচ্ছার কথাও ব্যক্ত করেছিলেন। তবে, এসব কথা বললেও এর অব্যবহিত পরে লেখক তাঁর আরেক বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম ‘ফর হোম দ্য বেল টোলস’ লেখার কাজে মনোনিবেশ করেন এবং সেটি লিখে শেষ করেন। এরপর ১৯৫১ সালের জানুয়ারি মাসের আগে তিনি আর তাঁর সেই গল্প লেখার কাজে ফিরে যাননি যেটিকে তিনি ‘সান্তিয়াগো গল্প’ বলে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে এই গল্পের যে অসাধারণ নির্মাণ তিনি করেন তাঁর ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’ নামের ক্ষুদ্রাকৃতির উপন্যাসে, সেটি তাঁকে প্রথমে ১৯৫৩ সালের পুলিৎজার সাহিত্য পুরস্কার এনে দেয়। এরপর ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলে তাঁর পুরস্কার সাইটেশনে উপন্যাসটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

এসব কিছুই আরো একবার প্রমাণ করে, যে কোন অসাধারণ সৃজনশীল কর্মের পেছনে এমন এক বা একাধিক গল্পের যোগান থাকে, যে গল্পগুলো নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। হতে পারে তা ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’ নামের উপন্যাস, অথবা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ নামের চিত্রকর্ম অথবা মোজার্টের কোন ‘সিম্ফনি’ অথবা সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ নামের সিনেমা। সাধারণ দৃষ্টিতে একেবারে সাদামাটা একটি ঘটনা বা বিষয়কে এভাবে অসাধারণ করে তুলতে মহান কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-সঙ্গীতজ্ঞ-সিনেমা পরিচালকগণ প্রয়োগ করেন তাঁদের সর্বোৎকৃষ্ট মেধা আর শ্রম। কখনো কখনো অতি তুচ্ছ একটি বিষয়ও লেখকের কলমের কালিতে এমন মহান ব্যাপ্তি নিয়ে পাঠকের চোখের সামনে হাজির হয় যে পরবর্তীতে ওই সামান্য ঘটনাটি সম্পর্কে জানা গেলে কেবল বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়।

‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’ উপন্যাসের পটভূমি তেমনই একটি সাধারণ ঘটনা মনে হয়েছে আমার কাছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মর্টার শেলের আঘাতে আহত সৈনিক হেমিংওয়ে সারা জীবন ছিলেন এডভেঞ্চারপ্রিয়। দানবীয় বুল ফাইটিং থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার এসব কিছুই ছিল তাঁর কাছে জীবন থেকে আনন্দ নিংড়ে উপভোগ করবার নানা মাধ্যম। একই সাথে এসবের ভেতর থেকে তিনি তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তি আর তীব্র সংবেদনশীল উপলব্ধি থেকে ছেঁকে নিতেন মানব জীবনের বীরত্ব, ঐশ্বর্য আর অসহায়ত্বের রহস্যময় নির্যাস।

হেমিংওয়ে বরাবর আমার কাছে এক অপ্রতিরোধ্য দুর্বোধ্য বন্য আবেগের নাম। আমি যত তাঁকে পড়ি, তত অভিভূত হই। আমার পাপাসক্তি (পাপার প্রতি আসক্তি) ঘনীভূত হতে থাকে। আর সে কারণেই কিনা জানি না, হেমিংওয়ে সম্পর্কিত ছোট-বড় কোন খবর/ঘটনা পারতপক্ষে আমার নজর এড়িয়ে যেতে পারেনা। সম্প্রতি বিখ্যাত মার্কিন ঔপন্যাসিক টনি মরিসনের মৃত্যুর পর তাঁর একটি পুরানো সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। ১৯৯৩ সালে প্যারিস রিভিউ পত্রিকার শরৎ সংখ্যায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি পড়ে মরিসনের জীবন এবং লেখালেখির চর্চা সম্পর্কে যা জানতে পাই, মাহাত্ম্য এবং গরিমায় তা লেখকের অসাধারণ সৃষ্টিকর্মের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত মরিসনের অফিসকক্ষে। এই কক্ষের বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী যে সমস্ত ডেকোরেশন আইটেমের কথা উল্লেখ করেছিলেন, তার মধ্যে ছিল হেমিংওয়ের কাছ থেকে পাওয়া একটি ক্ষমা প্রার্থনার নোট। সম্ভবত এটি একটি নকল নোটÑ যা কৌতুকের ছলে লেখককে কেউ পাঠিয়েছিল। আমার উৎসুক মন সেই বিশেষ ঘটনা জানবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো। অনেকভাবে খোঁজ করলাম। এখন পর্যন্ত হদিস করতে পারিনি। হয়তো একসময় জেনে যাবো। হয়তো, অসংখ্য অজানা ঘটনার ভিড়ে এই ছোট্ট গল্পটাও হারিয়ে যাবে। কিন্তু মরিসনের সাক্ষাৎকার পড়তে গিয়ে হেমিংওয়ে সম্পর্কিত সামান্য একটি উল্লেখ আমাকে আবারো সেই টেলিপ্যাথিক সাহিত্যিক যোগাযোগের কথা মনে করিয়ে দেয়। আরেকটি নিবন্ধ আমার দৃষ্টি জালে আটকা পড়ে যার শিরোনাম: ‘স্বয়ং হেমিংওয়ের চেয়ে টনি মরিসন আরও বেশি হেমিংওয়ে’। আমি নিবন্ধটি পড়তে শুরু করি আর ভাবি, মানুষের জীবনের শুরু থেকে শেষ পুরোটাই সমাধানের অতীত এক রহস্যের নাম।